সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নীরবতার সুরে

সামিউল্লাহ সম্রাট

চাঁদের আলোয় বেশ লাগছে । সাধারনত সন্ধ্যার পরপরই এদিকটা অনেক শান্ত হয়ে যায় । যানবাহন একেবারে নেই বললেই চলে । আমি আর অমিত হেটে চলেছি । শীত   বেশি অনুভূত হচ্ছে । শহর থেকে একটু দুরত্বেই শীতের এতটা তারতম্য হবে ভাবিনি ।
   
 শুনশান স্তব্দতা । বা পাঁশে টিলার উপরে সাদামত কি যেন চোখে পড়ল । অমিত আমার গায়ে টোকা দেয় । ভুতে বিশ্বাস না থাকলেও রাতের নির্জন আবহে সাদা রঙের কিছুর প্রতি একটা চমকে উঠার ব্যপার থাকে । আসলে ওগুলো গণকবর । সাদা টাইলসে মোড়ানো । চাঁদের আলো ওখান থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে । পাশ থেকে শেয়াল ডেকে উঠল । একটা, আরেকটা, আরেকটা, এবারে একদল শেয়ালের ডাক  নিরবতা ভেঙ্গে দিল । আমরা সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে এসে গেছি । বিনয় দাকে
ফোন দিলাম । ওর আরও কয়েকজন ততক্ষণে ইকোপার্কের সামনে পৌঁছে গ্যাছে।
 এসে দেখি হুলস্থূল ব্যাপার । দল অনেক ভারী । বাতিন ভাই, অসিম দা, রাজিব রাসেল,ফাহিম,পিয়েল,দলছুট শুভ, হিমেল সহ আরও সাত আট জন । স্থানীয়  পথ প্রদর্শক রতন হাজির । বিনয় দা, ফাইম  ট্রাইপড, ক্যামেরা আর বাতিন ভাই টেলিস্কোপ নিয়ে এসেছে ।চাঁদের ফটোগ্রাফি আর  সৌন্দর্য অবলোকনের পুরো ব্যবস্থা  প্রস্তুত । আমরা ইকোপার্কের পাশ দিয়ে প্রবেশ করলাম । এটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পেছনে । কয়েকটি মাঝারি উচ্চতার টিলা পরস্পরের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে । জঙ্গলের শুরু আরও খানিকটা পরে । চাঁদ যেন নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে এখানে । দিনের আলোর মত পরিষ্কার কিন্তু অনেক স্নিগ্ধ, মোলায়েম চারপাশ  আলোয় ভেসে যাচ্ছে । আমরা দলবেধে অনেকক্ষণ হাঁটলাম । রতন  জানালো এই অঞ্চলে একসময় অনেক ঘন বন ছিল । বাঘের আনাগোনা ছিল । এখন জঙ্গলে  সাপ ছাড়া তেমন কিছু চোখে পরেনা । এখন তো শীতকাল সাপের দেখা পাওয়াও দুষ্কর ।

হঠাৎ একজন প্রস্তাব দিল গানের বন্দবস্ত করলে ক্যামন হয় । কেউ কেউ বলল বনে উচ্চস্বরে গান করা খুব একটা ভাল কাজ হবেনা । সিদ্ধান্ত হল বন থেকে বেরিয়ে গানের আসর বসবে । ইঞ্জিনিয়ারং কলেজের দুজন আমাদের সাথে ছিল । যোগাড় হয়ে গেল গীটার সহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছু । ছবি তোলাও চলছে বিরামহীন । কে কত রকম করে  রুপময় চাঁদের বিভিন্ন মুহূর্ত গুলো ধরে রাখতে পারে একরকম প্রতিযোগিতাই যেন শুরু হয়েছে । এরকম পূর্ণিমায় বনাঞ্চলে কখনও ঘুরাফেরা করা হয়নি ।  অত্যন্ত মনমুগ্ধকর এই চাঁদনী রাতের দৃশ্য ।  
হাঁটাহাঁটি, ছবি তোলা শেষে শুরু হল গান বাজনা । লালন গীতিই সবার পছন্দ হিসেবে নির্বাচিত হল । তবে প্রথমে গাওয়া হবে রবি ঠাকুরের ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ । ইয়াসির আর সেতার ভাই আজকের শিল্পী । তবলায় হাত রাখলেন অসিম দা ।  বনের ধারে এক পুরনো ভবনের সিঁড়িতে বসেই জমে গেল গানের আড্ডা ।

খাঁচার ভেতর অচিন পাখি, কানার হাট বাজার, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, এরকম আরও অনেক গানের হৃদয়  মাতাল করা সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে  গেছি সবাই । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত এগারটা । রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে শীতও যেন বাড়ছে । ফেরা দরকার । আরও কিছুক্ষন আড্ডা দিয়ে আমরা ফেরার  পথ ধরলাম । ইচ্ছে করলে  সাধারন বিষয়গুলোকে অসাধারন করে উপভোগ করা যায় । আজকের আড্ডায় এটা যেন নূতন করে উপলব্ধি হল । শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি বদলেই ব্যস্তময় জীবনকে আনন্দময় করা অনেক সহজ ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...