ভোর রাত। ভেবে যাচ্ছি বাউল শাহ আব্দুল করিমকে। শুনছি তার গান। একটি গান নিয়ে একটু লিখলাম, এতখন বসে বসে -------
বাউল শাহ আব্দুল করিমের সরাসরি শিষ্য বাউল আব্দুর রহমানের কণ্ঠে শোনা একটি গানের কথা বলতে চাচ্ছি। বাউল শাহ আব্দুল করিমের বহুল প্রচলিত গান এটি নয় আব্দুল করিমের নিজের লিখা এবং সুর করা গানটি হচ্ছে "আমি আছি আমার মাঝে আমি করি আমার খবর। আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।"
অনলাইনে যতগুলো লিড়িক্স পেইজ বা ওয়েব সাইট আছে ওগুলোতে এই গানের পূর্ণ লিড়িক্স পেলাম না। বাউল শাহ আব্দুল করিমের সরাসরি শিষ্য বাউল আব্দুর রহমানের মুখ থেকে শোনা লিড়িক্সটি সংগ্রহ করে রাখলাম। লোকমুখে বা বর্তমান যেসব সঙ্গীত শিল্পীরা আছেন ফোক বা লোকসঙ্গীত শিল্পী টিভির পর্দায় বা রেডিওতে গান করেন তাদের কণ্ঠে এই গান কখনোই শুনি নি। একমাত্র বাউল করিমের শিষ্য আব্দুর রহমানের মুখেই গানটি শোনা। তিনিই একবার গানটি করেছিলেন লন্ডন ভিত্তিক বাংলা চ্যানেল এস টিভির পর্দায়।
পুরো গানটি হচ্ছে---
//আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।
এ জগতে আমি মূল, এছাড়া মিটে না গুল,
আমি বৃক্ষ, আমি ফুল, আমি মধু, আমি ভ্রমর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি আঁধার, আমি আলো, আমি আশেক, আমি মাশোক, যে বুঝে না, সে গিয়া বুঝুক কে বা আপন কেবা'রে পর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি আছি আমার বেশে, বসত করি মাটির দেশে,
আমি আমায় ভালোবেসে বাতাসে বাঁধিয়াছে ঘর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
বসে আছি আপন ঘরে, বুঝতে চাইনা অন্য কারে,
করিম বলে মরা মরে, আমি নিত্য আমি অমর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর। //
গানটি শুনে একটি ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে নিজের ভেতরে। গানটি আত্মতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব নাকি সংসারতত্ত্ব কোন কিছুই বোঝে উঠতে পারছিনা। গানের এক একটা কলি এক একরকম। জানিনা বাউল করিম কোন ভাবনা, বা পরিবেশে গানটি লিখেছিলেন। তবে আমার মনে হচ্ছে গানটি আত্মতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব এবং সংসারতত্ত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। শুরুতেই বলা হয়েছে, ''আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর। আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।'' প্রথম বাক্যটিতেই যেন নিজেকে উপলব্ধি করার কথা বলেছেন বাউল করিম। নিজের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- আমরা প্রত্যেকেই সবাই নিজেকেই একমাত্র জানি খুব ভালো করে। আমি কে, আমি কি করছি, আমি কি করতে পারি, আমি কি করে এসেছি বিগত দিনে একমাত্র নিজের কাছেই নিজের জানা। অন্য কেউ জানুক বা না জানুক।
দর্শন শাস্ত্র বলে, আত্মার পাঁচটি ক্লাসিফিকেশন আছে। ১.ভূতাত্মা (পঞ্চভূত), ২.মানবাত্মা (মন), ৩.মহাত্মা (জ্ঞান), ৪.জীবাত্মা (সাঁই), ৫. পরমাত্মা (কাঁই)। বাউল শাহ আব্দুল করিমের এই গানটির প্রথম অংশটা যেন ভূতাত্মা'ই পড়লো। আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমারা কি করি তা একমাত্র নিজের কাছে বোধগম্য। আর কারো কারো কাছে না হলেও।
গানের দ্বিতীয় বাক্যটিতে বলা হয়েছে, আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর। এখানে আবার দেহতত্মের প্রতিফলন পাওয়া যায়। এখনে আমি থাকলে অর্থাৎ 'আমি' শব্দ দ্বারা বোঝানে হয়েছে, নিজের প্রাণ বা আত্মা। 'আমি' শব্দকে এখানে রূপক ভাবে উপস্থাপন করেছেন বাউল করিম। বলা হয়েছে, আমি বেঁচে থাকলেই আমার দেহ চলবে। আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় কাজ করবে। অর্থাৎ মানুষের সজীব দেহটাকে সোনার সংসারের সাথে তুলনা করেছেন। জীবন প্রদ্বীপ নিভে গেলেই সংসার শূণ্য, বাসর খালি।
আমি আবার এ'ও চিন্তা করছি, গানের এই কথাটি সংসারতত্ত্ব বা বাস্তবিক অর্থে যদি চিন্তা করি, আমাদের সংসার জীবন সবই আমাকে অর্থাৎ আমাদের কেন্দ্রিক। পরিবার পরিজন বাবা মা ,ভাই বোন, বউ সন্তান পরিজন আমাদের নিজের উপস্থিতিতে ঘোর উৎসব আনন্দে মেতে থাকেন। পর্দার আড়াল হয়ে গেলেই পরিবেশের ভাবগাম্বীর্যতার কারণে হলেও আমাদের সেই ঘোর উৎসব আনন্দে ভাটা পড়ে। ঘোর-উৎসব-আনন্দ এই তিনটি শব্দ এই কারণেই ব্যবহার করলাম কারণ আমাদের চারপাশের পরিজনরা কোন না কোন ভাবেই এই তিনটি শব্দের মর্মভাব নিয়ে চলতে চান, এগিয়ে নিতে চান। গানের পরের কলিতে বলা আছে, 'এ জগতে আমি মূল, এছাড়া মিটে না গুল। আমি বৃক্ষ, আমি ফুল, আমি মধু, আমি ভ্রমর''। এখানে মনে হলো আমিই অর্থাৎ মানুষই জন্মদাতা। জন্মদাতা বাবাকে যেন 'মূল' বলেছেন। সেখানে করিম নিজে, রূপক অর্থে আমি বা আপনিও। যদি এই কথাগুলোকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেই। পরবর্তীতে বলেছেন করিম, আমি বৃক্ষ , আমি ফুল। উপরে যা বলছিলাম বাবা যদি মূল হোন, তবে সেই বাবা বৃক্ষ আর ফুল হচ্ছে সন্তান। আর শিশু সন্তান মানেই পবিত্র এবং পবিত্রতার অন্যনাম ফুল। মধু বা ভ্রমর সংসারের প্রেয়সী বা প্রিয়তমার ভালোবাসার সাতকাহন ধরে নিলাম। সেখান থেকেই সংসারতত্ত্বের চিন্তা এলো।
তৃতীয় কলিতে যেন আবার পেলাম আত্মতত্ত্বের ভাব। করিম বলেছেন, '' আমি আঁধার, আমি আলো। আমি আশেক, আমি মাশোক। যে বুঝে না, সে গিয়া বুঝুক কে বা আপন কেবা'রে পর।" এখানে আঁধার আলো দিয়ে নিজেই নিজের জীবন গড়ার, সামনে চলার পথ খুঁজে নেবার কথা বলছেন শাহ আব্দুল করিম। আত্মার অন্যতম একটি সেক্টর 'মহাত্মা' অর্থাৎ 'জ্ঞান' এর দেখা এখানে পেলাম এখানে। নিজেকে নিজে সুপথে চালালে নিজের জন্য আলো। নিজেকে ক্ষয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিলে নিজেই নিজের জন্য আঁধার। নিজকে নিয়েই যেন বাউল করিমের নিজের তত্ব।
চতুর্থ কলিতে বলা হয়েছে,'' আমি আছি আমার বেশে, বসত করি মাটির দেশে। আমি আমায় ভালোবেসে, বাতাসে বাঁধিয়াছে ঘর''। এটা যেন আবার দেহতত্ত্বের বাণী। নিজের দেহকে যেন তুলনা করেছেন 'মাটির দেশ' নামে। জীবন প্রদ্বীপ বা শ্বাস প্রশ্বাসকে বলেছেন বাতাসের ঘর।
সবশেষে বাউল করিম গেয়েছেন, মানুষের জয়গান। এখানে যেন রহস্য থেকে খানিক কিছুটা বাহিরে স্বভাবজাত বাউলের বেশে করিম। বলেছেন, "করিম বলে মরা মরে, আমি নিত্য আমি অমর''। বাউলরা বলে থাকেন মানুষের দেহ মরে, মানুষ নয়। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় থাকাকালীন সময়ে ফকির লালন শাহ'র এর সামধি এবং আখড়াবাড়িতে থাকা বাউলদের এই একই কথা শুনেছি নিজ কানে। বাউলরা বলেই থাকেন, বলে বেড়ান সব সময় মানুষ অমর। মানুষের দেহ মরে গেলেও, কাজ কীর্তি কখনই হারায় না। উদাহরণ দেই, এই গভীর রাতে বাউল করিমকে নিয়ে আমি নিজে ভাবছি। তবে বাউল করিম ত মরে যাননি, আমার কাছে করিম অমর। তবে বাউল করিমের কথাটাও সত্য যথার্ত।
শাহ আবদুল করিম, হাওরের শহর সুনামগঞ্জে কালনীর তীরে বেড়ে উঠা একজন সংগীত সাধক। দীর্ঘকায় সাদাসিধে একজন মানুষ। বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাউল গান ঘিরেই তাঁর স্বপ্নগুলো। একতারা, দোতরা সারিন্দা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছেন সুরে সুরে। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এই মহান সংগীত সাধক।
শাহ আবদুল করিমের গানের মূল উপকরণ হচ্ছে মানুষ। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে যাচ্ছে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি রচনা করেছেন গণসংগীত, বিচ্ছেদ, ধামাইল, জারি, সারি, ভক্তিগীতি, আল্লা স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি স্মরণ, পীর-মুর্শিদ স্মরণ, মনঃশিক্ষা, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, আঞ্চলিক, কেচ্ছা, পালা ও দেশের গান। দুঃখ, অভাব অনটন ছিল তাঁর চির সাথী। হাজারো দুঃখে পোড় খাওয়া করিম এভাবেই বলেন- 'দুঃখ বলব কারে/মনের দুঃখ বলব কারে/বাঁচতে চাই বাঁচার উপায় নাই/দিনে দিনে দুঃখ বাড়ে', শুধু দুঃখবোধ নিয়ে বসে থাকেননি করিম। বরং দুঃখ-নিরোধের সম্ভাব্য উপায়গুলোও চিহ্নিত করেছেন। বাউল আব্দুল করিম তাঁর গানে নজর কাড়া শব্দঝঙ্কার ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও অধিকার চেতনাই তাঁর গণসংগীত পর্যায়ভুক্ত গানের মূল বিষয়বস্তু ছিল।
শোষকের অবিচার-অত্যাচার-অন্যায় ঘিরে করিমের প্রতিবাদী কণ্ঠ তাই হতদরিদ্র সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। গান গাওয়ার সূত্র ধরেই পরিচিত হন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। বিচ্ছেদ রচনাতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনি বলেছেন- 'আমার বুকে আগুন বন্ধু/তোমার বুকে পানি/দুই দেশে দুইজনার বাস/কে নিভায় আগুনি রে/আর আমার দরদি নাই রে। তাঁর এই কথা থেকে সহজেই বোধগম্য হয় বিরহকাতর ব্যক্তির যন্ত্রণার অভিব্যক্তি তিনি কতটুকুই না উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
সুপ্রিয় পাঠক এবং বন্ধুরা, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বাউল শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে উনার লিখা ব্যাপক জনপ্রিয় 'আমি কূল হারা কলঙ্কিনী' গানটি সম্পর্কে কিছু কথা ইতিহাস তুলে ধরে ছিলাম। আজ একটি কম প্রচলিত গানের ব্যাখা করার চেষ্টা করলাম। আসলে সঙ্গীত এমন একটি জিনিস যে যেভাবে ভাবেন তার ব্যাখাটা ঠিক সেই ভাবেই হয়ে যায়। উপরে বাউল আব্দুল করিমের যেই গানটি নিয়ে আলোচনা করলাম সেটা সম্পূর্ণ নিজের ভাবনাটাকেই শেয়ার করলাম। ভূলভ্রান্তি অবশ্যি ক্ষমা করবেন। সংযোজন বিয়োজনে অবশ্যই পাঠকের সহযোগীতা চাই।
শাহ আব্দুল করিমের ১০২ তম জন্মদিন আজ। শ্রদ্ধা বাউল সম্রাট, ভাটির পুরুষের প্রতি।
লিখেছেন, মারূফ অমিত, অনলাইন এক্টিভিস্ট
বাউল শাহ আব্দুল করিমের সরাসরি শিষ্য বাউল আব্দুর রহমানের কণ্ঠে শোনা একটি গানের কথা বলতে চাচ্ছি। বাউল শাহ আব্দুল করিমের বহুল প্রচলিত গান এটি নয় আব্দুল করিমের নিজের লিখা এবং সুর করা গানটি হচ্ছে "আমি আছি আমার মাঝে আমি করি আমার খবর। আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।"
অনলাইনে যতগুলো লিড়িক্স পেইজ বা ওয়েব সাইট আছে ওগুলোতে এই গানের পূর্ণ লিড়িক্স পেলাম না। বাউল শাহ আব্দুল করিমের সরাসরি শিষ্য বাউল আব্দুর রহমানের মুখ থেকে শোনা লিড়িক্সটি সংগ্রহ করে রাখলাম। লোকমুখে বা বর্তমান যেসব সঙ্গীত শিল্পীরা আছেন ফোক বা লোকসঙ্গীত শিল্পী টিভির পর্দায় বা রেডিওতে গান করেন তাদের কণ্ঠে এই গান কখনোই শুনি নি। একমাত্র বাউল করিমের শিষ্য আব্দুর রহমানের মুখেই গানটি শোনা। তিনিই একবার গানটি করেছিলেন লন্ডন ভিত্তিক বাংলা চ্যানেল এস টিভির পর্দায়।
পুরো গানটি হচ্ছে---
//আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।
এ জগতে আমি মূল, এছাড়া মিটে না গুল,
আমি বৃক্ষ, আমি ফুল, আমি মধু, আমি ভ্রমর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি আঁধার, আমি আলো, আমি আশেক, আমি মাশোক, যে বুঝে না, সে গিয়া বুঝুক কে বা আপন কেবা'রে পর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
আমি আছি আমার বেশে, বসত করি মাটির দেশে,
আমি আমায় ভালোবেসে বাতাসে বাঁধিয়াছে ঘর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর।
বসে আছি আপন ঘরে, বুঝতে চাইনা অন্য কারে,
করিম বলে মরা মরে, আমি নিত্য আমি অমর,
আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর। //
গানটি শুনে একটি ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে নিজের ভেতরে। গানটি আত্মতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব নাকি সংসারতত্ত্ব কোন কিছুই বোঝে উঠতে পারছিনা। গানের এক একটা কলি এক একরকম। জানিনা বাউল করিম কোন ভাবনা, বা পরিবেশে গানটি লিখেছিলেন। তবে আমার মনে হচ্ছে গানটি আত্মতত্ত্ব, ভাবতত্ত্ব এবং সংসারতত্ত্বের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। শুরুতেই বলা হয়েছে, ''আমি আছি আমার মাঝে, আমি করি আমার খবর। আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর।'' প্রথম বাক্যটিতেই যেন নিজেকে উপলব্ধি করার কথা বলেছেন বাউল করিম। নিজের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন- আমরা প্রত্যেকেই সবাই নিজেকেই একমাত্র জানি খুব ভালো করে। আমি কে, আমি কি করছি, আমি কি করতে পারি, আমি কি করে এসেছি বিগত দিনে একমাত্র নিজের কাছেই নিজের জানা। অন্য কেউ জানুক বা না জানুক।
দর্শন শাস্ত্র বলে, আত্মার পাঁচটি ক্লাসিফিকেশন আছে। ১.ভূতাত্মা (পঞ্চভূত), ২.মানবাত্মা (মন), ৩.মহাত্মা (জ্ঞান), ৪.জীবাত্মা (সাঁই), ৫. পরমাত্মা (কাঁই)। বাউল শাহ আব্দুল করিমের এই গানটির প্রথম অংশটা যেন ভূতাত্মা'ই পড়লো। আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমারা কি করি তা একমাত্র নিজের কাছে বোধগম্য। আর কারো কারো কাছে না হলেও।
গানের দ্বিতীয় বাক্যটিতে বলা হয়েছে, আমি থাকলে সোনার সংসার, আমি গেলে শূণ্য বাসর। এখানে আবার দেহতত্মের প্রতিফলন পাওয়া যায়। এখনে আমি থাকলে অর্থাৎ 'আমি' শব্দ দ্বারা বোঝানে হয়েছে, নিজের প্রাণ বা আত্মা। 'আমি' শব্দকে এখানে রূপক ভাবে উপস্থাপন করেছেন বাউল করিম। বলা হয়েছে, আমি বেঁচে থাকলেই আমার দেহ চলবে। আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় কাজ করবে। অর্থাৎ মানুষের সজীব দেহটাকে সোনার সংসারের সাথে তুলনা করেছেন। জীবন প্রদ্বীপ নিভে গেলেই সংসার শূণ্য, বাসর খালি।
আমি আবার এ'ও চিন্তা করছি, গানের এই কথাটি সংসারতত্ত্ব বা বাস্তবিক অর্থে যদি চিন্তা করি, আমাদের সংসার জীবন সবই আমাকে অর্থাৎ আমাদের কেন্দ্রিক। পরিবার পরিজন বাবা মা ,ভাই বোন, বউ সন্তান পরিজন আমাদের নিজের উপস্থিতিতে ঘোর উৎসব আনন্দে মেতে থাকেন। পর্দার আড়াল হয়ে গেলেই পরিবেশের ভাবগাম্বীর্যতার কারণে হলেও আমাদের সেই ঘোর উৎসব আনন্দে ভাটা পড়ে। ঘোর-উৎসব-আনন্দ এই তিনটি শব্দ এই কারণেই ব্যবহার করলাম কারণ আমাদের চারপাশের পরিজনরা কোন না কোন ভাবেই এই তিনটি শব্দের মর্মভাব নিয়ে চলতে চান, এগিয়ে নিতে চান। গানের পরের কলিতে বলা আছে, 'এ জগতে আমি মূল, এছাড়া মিটে না গুল। আমি বৃক্ষ, আমি ফুল, আমি মধু, আমি ভ্রমর''। এখানে মনে হলো আমিই অর্থাৎ মানুষই জন্মদাতা। জন্মদাতা বাবাকে যেন 'মূল' বলেছেন। সেখানে করিম নিজে, রূপক অর্থে আমি বা আপনিও। যদি এই কথাগুলোকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেই। পরবর্তীতে বলেছেন করিম, আমি বৃক্ষ , আমি ফুল। উপরে যা বলছিলাম বাবা যদি মূল হোন, তবে সেই বাবা বৃক্ষ আর ফুল হচ্ছে সন্তান। আর শিশু সন্তান মানেই পবিত্র এবং পবিত্রতার অন্যনাম ফুল। মধু বা ভ্রমর সংসারের প্রেয়সী বা প্রিয়তমার ভালোবাসার সাতকাহন ধরে নিলাম। সেখান থেকেই সংসারতত্ত্বের চিন্তা এলো।
তৃতীয় কলিতে যেন আবার পেলাম আত্মতত্ত্বের ভাব। করিম বলেছেন, '' আমি আঁধার, আমি আলো। আমি আশেক, আমি মাশোক। যে বুঝে না, সে গিয়া বুঝুক কে বা আপন কেবা'রে পর।" এখানে আঁধার আলো দিয়ে নিজেই নিজের জীবন গড়ার, সামনে চলার পথ খুঁজে নেবার কথা বলছেন শাহ আব্দুল করিম। আত্মার অন্যতম একটি সেক্টর 'মহাত্মা' অর্থাৎ 'জ্ঞান' এর দেখা এখানে পেলাম এখানে। নিজেকে নিজে সুপথে চালালে নিজের জন্য আলো। নিজেকে ক্ষয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিলে নিজেই নিজের জন্য আঁধার। নিজকে নিয়েই যেন বাউল করিমের নিজের তত্ব।
চতুর্থ কলিতে বলা হয়েছে,'' আমি আছি আমার বেশে, বসত করি মাটির দেশে। আমি আমায় ভালোবেসে, বাতাসে বাঁধিয়াছে ঘর''। এটা যেন আবার দেহতত্ত্বের বাণী। নিজের দেহকে যেন তুলনা করেছেন 'মাটির দেশ' নামে। জীবন প্রদ্বীপ বা শ্বাস প্রশ্বাসকে বলেছেন বাতাসের ঘর।
সবশেষে বাউল করিম গেয়েছেন, মানুষের জয়গান। এখানে যেন রহস্য থেকে খানিক কিছুটা বাহিরে স্বভাবজাত বাউলের বেশে করিম। বলেছেন, "করিম বলে মরা মরে, আমি নিত্য আমি অমর''। বাউলরা বলে থাকেন মানুষের দেহ মরে, মানুষ নয়। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় থাকাকালীন সময়ে ফকির লালন শাহ'র এর সামধি এবং আখড়াবাড়িতে থাকা বাউলদের এই একই কথা শুনেছি নিজ কানে। বাউলরা বলেই থাকেন, বলে বেড়ান সব সময় মানুষ অমর। মানুষের দেহ মরে গেলেও, কাজ কীর্তি কখনই হারায় না। উদাহরণ দেই, এই গভীর রাতে বাউল করিমকে নিয়ে আমি নিজে ভাবছি। তবে বাউল করিম ত মরে যাননি, আমার কাছে করিম অমর। তবে বাউল করিমের কথাটাও সত্য যথার্ত।
শাহ আবদুল করিম, হাওরের শহর সুনামগঞ্জে কালনীর তীরে বেড়ে উঠা একজন সংগীত সাধক। দীর্ঘকায় সাদাসিধে একজন মানুষ। বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাউল গান ঘিরেই তাঁর স্বপ্নগুলো। একতারা, দোতরা সারিন্দা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছেন সুরে সুরে। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এই মহান সংগীত সাধক।
শাহ আবদুল করিমের গানের মূল উপকরণ হচ্ছে মানুষ। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে যাচ্ছে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি রচনা করেছেন গণসংগীত, বিচ্ছেদ, ধামাইল, জারি, সারি, ভক্তিগীতি, আল্লা স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি স্মরণ, পীর-মুর্শিদ স্মরণ, মনঃশিক্ষা, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, আঞ্চলিক, কেচ্ছা, পালা ও দেশের গান। দুঃখ, অভাব অনটন ছিল তাঁর চির সাথী। হাজারো দুঃখে পোড় খাওয়া করিম এভাবেই বলেন- 'দুঃখ বলব কারে/মনের দুঃখ বলব কারে/বাঁচতে চাই বাঁচার উপায় নাই/দিনে দিনে দুঃখ বাড়ে', শুধু দুঃখবোধ নিয়ে বসে থাকেননি করিম। বরং দুঃখ-নিরোধের সম্ভাব্য উপায়গুলোও চিহ্নিত করেছেন। বাউল আব্দুল করিম তাঁর গানে নজর কাড়া শব্দঝঙ্কার ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও অধিকার চেতনাই তাঁর গণসংগীত পর্যায়ভুক্ত গানের মূল বিষয়বস্তু ছিল।
শোষকের অবিচার-অত্যাচার-অন্যায় ঘিরে করিমের প্রতিবাদী কণ্ঠ তাই হতদরিদ্র সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। গান গাওয়ার সূত্র ধরেই পরিচিত হন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। বিচ্ছেদ রচনাতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনি বলেছেন- 'আমার বুকে আগুন বন্ধু/তোমার বুকে পানি/দুই দেশে দুইজনার বাস/কে নিভায় আগুনি রে/আর আমার দরদি নাই রে। তাঁর এই কথা থেকে সহজেই বোধগম্য হয় বিরহকাতর ব্যক্তির যন্ত্রণার অভিব্যক্তি তিনি কতটুকুই না উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
সুপ্রিয় পাঠক এবং বন্ধুরা, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বাউল শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে উনার লিখা ব্যাপক জনপ্রিয় 'আমি কূল হারা কলঙ্কিনী' গানটি সম্পর্কে কিছু কথা ইতিহাস তুলে ধরে ছিলাম। আজ একটি কম প্রচলিত গানের ব্যাখা করার চেষ্টা করলাম। আসলে সঙ্গীত এমন একটি জিনিস যে যেভাবে ভাবেন তার ব্যাখাটা ঠিক সেই ভাবেই হয়ে যায়। উপরে বাউল আব্দুল করিমের যেই গানটি নিয়ে আলোচনা করলাম সেটা সম্পূর্ণ নিজের ভাবনাটাকেই শেয়ার করলাম। ভূলভ্রান্তি অবশ্যি ক্ষমা করবেন। সংযোজন বিয়োজনে অবশ্যই পাঠকের সহযোগীতা চাই।
শাহ আব্দুল করিমের ১০২ তম জন্মদিন আজ। শ্রদ্ধা বাউল সম্রাট, ভাটির পুরুষের প্রতি।
লিখেছেন, মারূফ অমিত, অনলাইন এক্টিভিস্ট

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন