সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ক্রিকেটময় এনজিএফএফ: ভালোবাসার ফেঞ্চুগঞ্জ- ২

লিখেছেন- চৌধুরী মারূফ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, এনজিএফএফ স্কুল 

"ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা" শব্দ দুটো শুনলেই চোখে ভেসে উঠবে সারকারখানার মেইন গেইট সংলগ্ন বড় মাঠের ছবি। প্যাভেলিয়ন ঘেঁষা বড় মাঠ শুধু ফেঞ্চুগঞ্জ নয় পুরো সিলেট জেলা এবং বিভাগের ক্রীড়াময় পরিবেশের উজ্জ্বল স্বাক্ষী। ওসমানী গোল্ড কাপ, সারকারখানা স্কুল এথলেটিক্স, বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ক্লাব ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং বর্তমানে ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর সাথে অতপ্রত ভাবে মিশে আছে এই খেলার মাঠ । শুধু তাই নয় দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফেঞ্চুগঞ্জ আসা যাওয়ার জন্য হেলিপ্যাড হিসেবেও এই মাঠ ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সবসময় ক্রিকেট উর্বর উপজেলা। কাশেম আলী স্কুল মাঠ, মাইজগাঁও স্টেশন সংলগ্ন খেলার মাঠ উপজেলার ক্রিকেট এবং ফুটবল প্রেমীদের তীর্থস্থান।


ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার এলাকায় একসময় ছোট বড় অনেক খেলার মাঠ ছিল। কলাবাগান এরিয়ার সবুজ সংঘ মাঠ, জামে মসজিদের পাশে মিতালী ক্লাবের মাঠ, আইটি বিল্ডিং এর পাশে নতুন কুড়ি খেলার মাঠ, হাউজিং কলোনীর গোরস্থান খেলার মাঠ, আমবাগান খেলার মাঠ এবং পার্কের মাঠের স্মৃতি এখনো চোখে লেগে আছে। নতুন শাহজালাল সারকারখানা নির্মাণের পর মাঠ গুলো হারিয়ে গেছে । অবশিষ্ট আছে কিন্ডার গার্টেন স্কুলের কিছু জায়গা। দুইটার পর স্কুল ছুটির পর মাঠ গুলোতে এমন কোন দিন নেই যে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং বর্ষার মৌসুমে ফুটবল খেলা হয় নি। এক সময় একটা শ্লোগান ছিল "হৈ হৈ রৈ রৈ নতুন কুড়ি গেলো কই" ক্লাব ভিত্তিক সেই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এখন হারানো স্মৃতি। মহাবয়েজ ক্লাব, নতুন কুড়ি, ভিক্টোরিয়া, মিতালী, সবুজ সংঘ ক্লাব এখন আর নেই। এক সময় এক ক্লাবগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিল সারকারখানা এলাকায়। প্রতিযোগিতা করে খেলাধুলার আয়োজন, জার্সি তৈরি, ট্র্যাকস্যুট তৈরি বা কমিটি গঠন করা হতো। খেলাধুলার সেই স্বর্ণযুগ এখন হারানো স্মৃতি।


খেলাধুলার কথা বলতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেও শেষ করা যাবেনা। তবে আশার কথা হচ্ছে ইদানিং সারকারখানার এই খেলাধুলার পরিবেশ বেঁচে আছে একমাত্র ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর মাধ্যমে। ইদানিং পুরান বাজারের পি পি এম স্কুল, ফেঞ্চুগঞ্জ কলেজ এবং মনিপুর চা বাগানের মাঠেও কিছুটা বিভিন্ন রকএর টুর্নামেন্ট বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার আয়োজন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় আসর হচ্ছে সারকারখানার ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আমার কাছে একটি আবেগের জায়গা। এখানে প্রতি ম্যাচ যেন এক একটি উৎসবের দিন। এই টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ে সারকারখানা এলাকায় অঘোষিত পুনর্মিলনী হয়ে থাকে এন জি এফ এফ স্কুলের প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন ব্যাচের অক্লান্ত পরিশ্রমে চলছে এই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। আবেগ ভালোবাসা রাগ অভিমান আলোচনা সমালোচনা দক্ষতা সৃজনশীলতার এক মহা উৎসব যেন এই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বলতে যদি হয় তবে প্রতি ব্যাচের প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে বলতে হবে সবার অবদানের কথা।


স্কুল ব্যাচ- এ ব্যাচের কথা যদি বলি তবে বলতে হবে এরা সাহসী ব্যাচ। এই স্কুল ব্যাচ থেকেই আমাদের প্রত্যেক ব্যাচের জন্ম। তারা আমাদের প্রেরণা এবং প্রজন্ম দুটো'ই।
২০১৯ এবং ২০১৮ ব্যাচের কথা যদি বলি, তবে এরা আগমনী । তাদের শিখতে হবে এগুতে হবে।  ২০১৭ ব্যাচ। উদ্যোমী বালক গুলো যেন এক একটি বারুদ। আগুন লাগলেই যেন তারা আকাশ চুম্বী। মাঠ রেডি কার্পেটিং থেকে শুরু করে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম। ২০১৫ এবং ২০১৬ ব্যাচ। বর্তমান আসরে ২০১৫ বেশ গতিশীল, ভালো পারফর্মেন্স । চকচকে এবং কালার ফুল জার্সির জন্য ২০১৬ ব্যাচ একশোতে একশ । ২০১৩ এবং ২০১৪ ব্যাচ, এদের কথা বেশি লিখলে হয়ত রচনা লিখতে হবে। আয়োজন ব্যাচ ২০১৪, বেশ কয়েকবার অন্তত সুন্দর আয়োজন করেছে। নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।  ২০১০, ২০১১ এবং ২০১২ ব্যাচ। দশ এবং এগারোর কথা বললে নিজের গুণগান করতে হবে। তবে কথা হচ্ছে নিজের ব্যাচ দশ হারা জিতা যেকোন মুহুর্তেই পাশে থাকার আকুলতা। নিজেদের অবদান আর হয়ত না'ই বললাম।  ২০১২ ব্যাচ স্বভাবত শান্ত সুলভ চমৎকার । ২০০৯ থেকে যদি ২০০১ বা ২০০০ ব্যাচ পর্যন্ত বলি তবে সবার কাছ থেকেই শিখেছি, শিখছি। আমরা শিখে যাবো। কেউ কোন ভাবেই বিফল নইয়, প্রত্যেকেই সফল এবং সাবলীল।


এই ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে, তবে হার জিত সমর্থন অসমর্থন কোনটাই বড় নয়, এই আয়োজনটি একটি আবেগের জায়গা, স্পৃহা। সবশেষে একটি কথা বলেই ইতি টানতে হবে, ১ হাজার বছর পর আমি নিশ্চই থাকবো না, তবে না ফেরার দেশ থেকে বসে হয়ত শুনব " কিছু ক্ষণের মধ্যেই শুরু হচ্ছে এনজিএফএফ স্কুলের ব্যাচ ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর হাজার তম  ঐতিহাসিক আসর........." এটি শুনে হয়ত অভিবাদন জানাবো অজানা থেকে। এভাবেই একটি ভালোবাসা টিকে থাকবে যুগ যুগ যুগান্তরে।     


ছবি- লেখক, email: marufomit94@gmail.com 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...