সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’ প্রসঙ্গে আইনি ভাবনা

 ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’। বাক্যটির সঙ্গে দেশের সকল মানুষ কমবেশি পরিচিত। কোনও রাজনৈতিক কর্মী থেকে শীর্ষ নেতা কিংবা কোনও সামাজিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে স্থানে স্থানে সাঁটানো হয় নানা রঙের পোস্টার। তাতে বড় হরফে লেখা থাকে ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’। বন্দী ব্যক্তির কাংখিত মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত অলিগলি রাজপথে শ্লোগান সমাবেশে বারবার উচ্চারিত হয় ‘নিঃশর্ত মুক্তি চাই’। এ বাক্যটিকে নিয়ে লেখার শুরুতে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় উপস্থাপন যুক্তিযুক্ত মনে করছি।

কোনও ফৌজদারি মামলায় আসামির জামিনের প্রয়োজন হলে প্রথম সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদনটি করতে হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮-এর (৫ নম্বর আইন) ৪৯৬ ও ৪৯৭ ধারার বিধান থেকেই জামিন মঞ্জুরের ক্ষমতা পেয়ে থাকেন। এজাহার, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী, পুলিশ ডায়েরি, তদন্ত প্রতিবেদন, আলামত উদ্ধার, ১৬১ ধারামতে গৃহীত সাক্ষ্য ও ১৬৪ ধারার বিবৃতি ইত্যাদি পর্যালোচনা করে উত্থাপিত অভিযোগের ধরন ও প্রকৃতি এবং জামিনযোগ্য অযোগ্য এর উপর ভিত্তি করে আদালতের বিচারক জামিন দেয়া না দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

দেশের ফৌজদারি আদালত গুলোতে জামিন শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও জামিনের সংজ্ঞা ফৌজদারি কার্যক্রমের কোথাও দেয়া নাই। জামিনের বিধি বিধান ফৌজদারি কার্যবিধির অন্তনিহিত বিষয়। আইনের চোখে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে গণ্য করা যায় না, তিনি অভিযুক্ত মাত্র। আসামি যাতে আদালতের আদেশ মতো নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হয়, সেজন্য আইনে জামিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ থেকে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় বিচারের সময় আসামির উপস্থিতি নিশ্চিত করাই হচ্ছে জামিনের উদ্দেশ্য। জামিন আদেশের মাধ্যমে আসামিকে মুক্তি দেয়া হয় এই শর্তে যে তিনি বিচারে উপস্থিত হবেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৯ ধারা অনুয়ায়ী আসামিকে জামিনদারসহ একটি মুচলেকা সম্পাদন করতে হয়। জামিনদার কর্তৃক জামিন মুচলেকা সম্পাদন আদালত ও জামিনদারের মধ্যে সম্পাদিত একটি সরল চুক্তি। জামিনদার অবশ্যই চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম ব্যক্তি হবেন। এই মুচলেখায় জামিনদার চুক্তিবদ্ধ হন আসামিকে নির্দেশিত তারিখ ও সময়ে আদালতে অবশ্যই হাজির করবেন, এতে ব্যর্থ হলে জামিননামায় বর্ণিত টাকা প্রদানে তিনি বাধ্য থাকবেন। এখানে জামিনদারই প্রধান ব্যক্তি এবং আসামি চুক্তির বিষয়বস্তু।

আমরা জানি, কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে নির্দোষ হিসেবে গণ্য করতে হয়। এই নির্দোষিতা অনুমান করে আসামিকে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার জন্য যথাযথ জামিনদারের মুচলেখায় জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। খুবই গুরুতর অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত না হলে আসামির স্বাধীনতা খর্ব করা উচিত নয়। জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিনে আসামির মুক্তিলাভ সংবিধিবদ্ধ অধিকার হলেও জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন কখনও অধিকার নয়।

নিরপরাধ ভালো মানুষ ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেল হাজতে যাওয়ার প্রচুর ঘটনা আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। শুত্রুতামূলক কিংবা সন্দেহভাজনভাবে নিরপরাধ ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে জেল হাজতবাস করতে পারেন, যদিও এটি কোনওভাবেই কাম্য নয়। আবার অনেক সময় অতিরঞ্জিতভাবে অপরাধমূলক ঘটনার বর্ণনা এবং তাতে বানোয়াট বক্তব্য যুক্ত করা, মামলা দায়েরকারী পক্ষের ভূমিকাকে গোপন রাখার প্রবণতা কিংবা প্রকৃত বিষয়কে অত্যধিক মাত্রায় উপস্থাপন করার প্রবণতা আমাদের সমাজে করা হয়ে থাকে। এ সকল কারণে প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞ বিচারকের কাছে অভিযোগটি সত্য বলে মনে হতে পারে। এতে করে অনেক সময় নিরপরাধ মানুষকেও পোহাতে হতে পারে হাজতবাসের যন্ত্রণা।

সীমিত পরিসরে চলাফেরার শর্তে জামিন মঞ্জুর হতে দেখা যেত একটা সময়ে। জামিন মঞ্জুরের বিষয়ে কোনও শর্ত আরোপ করা আইনের চোখে অগ্রহণযোগ্য। বই পুস্তক ঘেঁটে জানতে পারি, একটা সময় টাউন জামিনের প্রচলন ছিল। টাউন জামিন কোনও আসামি পেলে তাঁকে নির্দিষ্ট টাউনের সীমানার মধ্যেই থাকা ও চলাফেরার অধিকার দেয়া হতো। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমনও শর্ত দেয়া হতো যে, জামিনপ্রাপ্ত আসামি প্রত্যেক দিন বা সপ্তাহে একদিন আদালতে বা পুলিশের নিকট হাজির হয়ে প্রমাণ করবে যে, তিনি জামিনের কোনও শর্ত ভঙ্গ করেননি। এই শর্তগুলো জুড়ে দেয়া হতো এ কারণে যে, আসামি তার নিজ এলাকায় গিয়ে ঘটনার সাক্ষ্য ও আলামত নষ্ট করতে পারেন কিংবা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেন এমন সন্দেহ থেকে। এমন শর্তাধীন জামিনে আসামিকে প্রতিনিয়ত জামিনের শর্তাবলী মেনে চলতে হতো। মামলা ধার্য থাক বা না থাক আসামিকে প্রত্যেক দিন হাজির হওয়ার মুচলেকা অযৌক্তিক বলে সিদ্ধান্ত বিভিন্ন নজিরে দেখা যায়। জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে কোনও শর্ত আরোপ করা যায় না। তবে শর্ত থাকে যে, আসামি বন্ড দাখিল করলে তাকে রিলিজের আদেশ প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে জামিন মঞ্জুরের পর বন্ড দাখিল ও গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সেই আসামি জামিনে মুক্তি পায় না।

এমন কোনও শর্তে জামিন মঞ্জুর যা পূরণ করা অসম্ভব, তা জামিন প্রত্যাখ্যানেরই শামিল।

জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন মঞ্জুরে শর্ত আরোপ করা যায় না। কারণ জামিনে যাওয়া সেই লোকের অধিকার এখানে আদালতের স্ববিবেচনার প্রশ্ন অবান্তর। তবে, জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের স্ববিবেচনার ক্ষমতা রয়েছে বিধায় জামিন মঞ্জুরের সময় ন্যায়সংগত শর্ত আরোপ করা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত শর্ত খুব ব্যপক নয় যে, ম্যাজিস্ট্রেট যে কোনও শর্ত আরোপ করতে পারবেন এবং আসামি নির্দিষ্ট স্থানে থাকতে হবে। যদিও জামিননামায় কতিপয় শর্ত ও বিধির উল্লেখ থাকে কিন্তু আসামি আদালতে হাজির হওয়ার শর্ত ছাড়া জামিন মঞ্জুরের পূর্বশর্ত হিসেবে অন্য কোনও শর্ত আরোপ করা যায় না। আসামি অপরাধের পুনরাবৃত্তি করবে না, এমন শর্ত বা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করা যায় না। এমন শর্তে জামিন মঞ্জুর করলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৯ ধারার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও বিভিন্ন নজিরে উল্লেখ পাওয়া যায়।


লেখক : দেবব্রত চৌধুরী লিটন,  আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট। 




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...