সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার ঈমান জায়নামাজের সেজদায়, মূর্তি ভাঙ্গায় নয়


ফ্রান্সে বসবাস করছি প্রায় তিন বছরের উপরে৷ এখানের পার্মানেন্ট রেসিডেন্স প্রাপ্ত মানুষ আমি। ফ্রান্সে যেসব ধর্মগোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করেন তাদের মধ্যে কেথলিক, মুসলমান এবং ইহুদি উল্লেখযোগ্য৷ এখানে ধর্মীয় মাইনোরিটি হচ্ছে মুসলমান এবং ইহুদি। এখানে ধর্মীয় এবং বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর বসবাস৷ মুসলমান এবং ইহুদিদের অধিকার আদায়ে এখানে আমি সর্বদা সোচ্চার। সাংবাধিক ভাবে ফ্রান্স ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র৷ এখানে রাষ্ট্র ধর্মীয় আচার ব্যবহার পালন করে না। যেমন আপনি এখানে অফিস আদালতে ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করতে পারবেন না। এমনকি পোষাকেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় কোন ধর্মের সাইন লগো পোষাক ব্যবহার করতে পারবেন না। 

তবে এখানে যে সব ঠিকঠাক তা নয়। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব গুলোর ছুটি নিয়ে৷ এখানে নয়েলে (ক্রিসমাসে) বন্ধ থাকলেও মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের পূজা বা ইহুদিদের লাগ বি'ওম উৎসবে ছুটি দেয়া হয়না সরকারী ভাবে। মোটা দাগে এই অংশে আমার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রমাণ পাইনা ফ্রান্সে। 

যাই হোক যা বলতে চাচ্ছিলাম, আমার ঈমান এত দুর্বল নয় যে আরেকজনের মূর্তি ভেংগে প্রমাণ করতে হবে আমি আমার ধর্ম বিশ্বাসে পাকাপোক্ত।  বারবার একটি কথা মনে পড়ে গেলো খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি রহমতুল্লাহ আলাইহির ' যে বিপদে মানুষকে সাহায্যের সময় ধর্ম বর্ণের পার্থক্য খোঁজবেনা'। অথচ আমাদের বিশ্বাসের মাত্রা এই মহান সাধক থেকে একটুও বেশি নয় কিন্তু তারা ভাঙ্গাভাঙ্গিতে কতখানি না এগিয়ে। যারা এসব কাজ করেছেন অহরহ।  

প্রথম থেকেই বলছি এটা রাজনৈতিক একটি চাল ছিল। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে কোন ভাবে যদি একটি দাঙ্গা বাঁধানো যায়, তবেই ত হলো। এখানে রাজনৈতিক দুই পরাশক্তি আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি স্পষ্টত ভাবে একে অপরকে দোষারোপ করছেন৷ অথচ উচিৎ ছিল সম্মিলিত ভাবে এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসকে মোকাবেলা করা। 

আমি ব্যক্তিগত ভাবে আমার কথাই বলছি, সম্ভ্রান্ত মুসলামান পরিবারে জন্ম নেয়া আমি সব সময় সম্প্রীতির শিক্ষা পেয়েছি। নামাজ রোজা পালন করে ইফতারের সময় পাশের হিন্দু প্রতিবেশীর বাসায় ইফতার পাঠানো আমার দেখা ২৯ বছরের প্রথা। আমার ঈমান আমার কাছে, আমি যেখানে সেজদা করি, যাকে সেজদা করি সেটা আমার অন্তর আত্মার হিসেব দিতে। আমার কাজে কর্মের হিসেব দিতে। এই সেজদায় আল্লাহ ছাড়া কেউ সামিল থাকার প্রশ্নই আসেনা। আমার এই সেজদা আমাকে এই শিক্ষা দেয়নি যে পাশের বাসার তুলসি বেদী ভেঙ্গে চুরমার করে দাও। আমাকে আমার সেজদা শিক্ষা দিয়েছে - 'সেল্ফ কন্ট্রল, সেল্ফ কন্ট্রল, বি সেল্ফ কন্ট্রল'। 

বিগত এই তিন দিন যা ঘটে গেলো, আবারও বলছি এটা সম্পূর্ণ সাজানো রাজনৈতিক একটি খেলা। আর এই সুযোগটা নিচ্ছে স্থানীয় কিছু নষ্ট পচা রাজনীতিবিদ, যারা চেয়ারম্যান মেম্বার উপজেলা চেয়ারম্যান আর ঠিকাদার হতে মত্ত। ১৯৭১ এর আগ থেকে এ পর্যন্ত বারবার কয়েক হাজার বার এমন ঘটনা ঘটেছে। ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের আগে আমাদের ব্লগার লেখক কলামিস্টদের এভাবেই ব্লগার শব্দের অপর নাম নাম নাস্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিনে দুপুরে চাপাতি দিতে মস্তক ছিন্নবিন্ন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে স্থানীয় কিছু নষ্ট পলিটিশিয়ান। সত্য বলতে গেলে বিভিন্ন দল থেকে ছুটে আসা আওয়ামীলীগে হিজরত করা এই ভ্রষ্টরাই এসব কাজ করেছে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলতে গেলে, আমার পিছনেও লেগেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলে তারা আর পেরে ওঠেনি আমার সাথে৷ এটা শুধু আমার কথা নয়, হাজার হাজার এমন মানুষ তাদের দ্বারা আক্রান্ত। আর তাদের উসকানির মূল টার্গেট হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। 

শেষমেষ মনসুর হাল্লাজের 'আনাল হক' এর ঘটনা আমরা সবাই জানি। কুকুর কে পানি খাইয়ে বেহেশতে যাওয়া নারীর গল্প সবাই বলি, কিন্তু মানুষের রক্ত ঝরতে দেখলে আমাদের হৃদয় কাঁপে না। এত ঠুনকো ঈমান আমার নয়, যে পাশের বাড়ির লোক মেরে, তার চোখের জ্বলে আমার ঈমান তাজা করব। আমার ঈমান জায়নামাজের সেজদায়, অন্য ধর্মের প্রতিবেশীর মূর্তি ভাংগায় নয়। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কথা, এটাই আমার ঈমান।

লিখেছেন : চৌধুরী মারূফ অমিত, সাংবাদিক 





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...