অগ্রহায়ণের শেষে মিঠা বিকেল অনেক আগেই পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। চিরোচেনা চা বাগান শান্ত, হালকা কুয়াশার হাতছানি পড়ছে এপাশ ওপাশে। দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে। প্রায় দুই শতাব্দী আগে ভারতের আসাম উড়িষ্যা বিহার থেকে নিয়ে আসা শ্রমিকদের দিয়ে ইংরেজরা লর্ডরা এই চা বাগান গড়ে তুলে ছিলেন আমার পূর্ব পুরুষের মাটিতে। চা বাগানের কোলে বেড়ে ওঠা আমার জীবন অনেকটা চা পাতার মতই বলা যায়। কখনো সবুজ সফেদ, কখনো বৃষ্টির অপেক্ষায় ফুল দিতে, আবার পানি জমতে দেবেনা গোঁড়ায়।
ঘুম থেকে উঠে দেখি দুপুর শেষের পথে বিকেলের শুরু। মা এখনো ফিরেননি স্কুল থেকে। কাজ রাজনীতি শেষে খানেক বিশ্রাম নেওয়া বাবা বাহিরের ঘরে কার সাথে যেনো টেলিফোনের রাজনীতির আলাপ করছেন। উঠে সোজা সাপ্টা নিয়মের ব্রাশিং শেষে গোসল করে কোনমতে খেতে খেতেই মা চলে এলেন বাসায়, স্কুল শেষ। মায়ের মুখ দর্শন দেখেই বন্ধু মুহিতকে ফোন। তারা আসা অব্দি আমাদের সারকারখানার পুরাতন মেডিক্যালের কোণায় এপাশ ওপাশ করতেই সে এসে হাজির। তার মোটর সাইকেলের পেছনে বসে সোজা আমাদের সারকারখানা বাজারের ঐতিহ্যবাহী গার্ড ব্যারাক মসজিদের সামনের বন্ধু তুরাব ভূইয়ার দোকানের সামনে দুলালের চায়ের টং এ। চিনি কম কড়া লিকারের চা খেয়ে, গাড়িতে বসে সিগারেট ফুঁকিয়ে ফুঁকিয়ে সারকারখানা বিশাল বড় মাঠের কিনারা ঘেঁষে চা বাগানে। মেঠো বালু মাখা পথ বেয়ে চলে মোটর সাইকেল। কখনো কখনো স্পিড বেশি বাড়ালে বালুতে গাড়ি স্লিপো করতো। সাবধানতার কারণে পেছন থেকে লাফ দিয়ে নেমে যাওয়া হতো মাঝে মাঝে। পড়ন্ত বিকেলে সন্ধ্যের শুরুতে চা বাগানে হরেক রকমের আনাগোনা দেখা যায়। ২০ থেকে ২৫ টাকা খুবই অল্প এবং একদম সীমিত আয়ে খানেক সয়াবিন, অল্প কেরোসিন এবং টুকটাক বাজার বা ১ কেজি চাল নিয়ে কোন চা শ্রমিক ফিরছেন তার মাটির ১২ ফুট বাই ১২ ফুট ঘরে। চা শ্রমিকদের লেবার লাইন্ব্র ঘরগুলো খুবই ছোট এবং খুবই অমানবিক জীবন কাঁটাতে হয় চা শ্রমিকদের। দেখা যেতো সারকারখানা পাড়ার কয়েকজন চাচী বা খালাম্মা হাঁটছেন ডায়বেটিস জনিত রোগের কারণে। চাচাদের ও দেখা যেতো বেশ জোরালো ভাবে ব্যায়ামের জন্য হাঁটছেন। চুংগা টাইপে টুপি, হালকা পাতলা কোথাও কোথায় ছিঁড়ে গিয়েছে পাঞ্জাবি, কমদামী চেকের লুঙ্গি পড়ে কেউ হয়তো ছুটছেন মাগরিবের নামাজে। আবার চা শ্রমিক নারীরা বাচ্চা কাপড়ে বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে, একহাতে চা পাতার ঝোলা বাগানের কর্মরত টিলাবাবুকে বোঝিয়ে দিয়ে ফিরছেন উনার নীড়ে। অল্প অল্প করে চা বাগানের কোলঘেঁষা আনসার ক্যাম্প, পাহাড়ি ছড়ার উপর ব্রিজ ক্রস করে আমাদের মোটর সাইকেল চা বাগান বেঁয়ে এগুচ্ছে বাগানের ছোট ছোট টং এর দিকে৷ আবার কাচুমুচু করে কেউ হয়তো যাচ্ছেন নেশায় মগ্ন হাড়িয়া মদের পট্টিতে। বিচিত্রতায় ভরা চা বাগানের সন্ধ্যার প্রথমাংশ এভাবেই শুরু হয়।
এলাকার দুই পাশে চা বাগান। মনিপুর, ইন্দানগর-উত্তরভাগ। মনিপুর আমাদের পড়লেও হিসাব মতে ইন্দানগর উত্তরভাগ মৌলভিবাজারের রাজনগর উপজেলায় পড়ে। এক পাশে সিলেট- মৌলভীবাজার-ঢাকা হাইওয়ে। আর একপাশে এই পাহাড়। আমার বাসা থেকে হাফ কিলো দূরে হবে। এর নাম লাল টিলা। আমরা বলি 'ছুলাইল টিল্লা'। 'ছুলাইল' একটি সিলেটি শব্দ, যে জায়গাটা আগাছা বা লোম ইত্যাদি মুক্ত থাকে তাকে আমরা ছুলাইল বলি। এই টিলায় কোন গাছপালা বা আগাছা নাই বলে আমরা একে ছুলাইল টিলা বলি। আমাদের ছোট বেলা একটা মিথ ছিল, ৭ টা ভূত বা দানব এসে এই টিলার সব গাছপালা, আগাছা বেছে দিয়েছে। ছোটবেলা আরো ভাবতাম, আকাশটা মনে হয় এই পাহাড়ের সাথে গিয়ে লেগে গেছে। বড় গুহা আছে পাহাড়ে, আলীবাবার মত।
কিন্তু এ সব কিছুই মিথ। মূল কথা হচ্ছে স্বাধীনতার বহু আগে আমাদের এলাকায় জাপানিরা নির্মান করেছিল ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা। এই সারকারখানার বদৌলতে পুরো ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকা আজ আপডেট। চা বাগানের গভীর জঙ্গলেও থ্রিজি নেটওয়ার্ক কাভারেজ। এই টিলার জঙ্গল মূলত ওরাই পরিষ্কার করছিল বলে জানা যায়। আমাদের বর্তমান মুরব্বীরাও ছিলেন এদের সাথে। দাদা নানারা কাজ করেছেন। পরবর্তীতে এমোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে এই টিলায় আর কোন গাছপালা হয়নি। সেই থেকেই লাল টিলা।
আমরা স্কুল ভাগা দিয়ে অনেক আড্ডা দিয়েছি এই টিলায়। টুকটাক ধোঁয়া উড়ানোও শিখা এই টিলার চিপায় চাপায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই টিলার ধারে ওপারে মুজিবুল্লাহ চাচার আনারস বাগান ছিল। স্কুল ভাগা পরে চাকু আর লবণ নিয়ে আনারস ভোজন চলত অখানে। টিলার ভাজে ভাজে থাকা গর্তে পানি মিলত। লাল লাল বিশাল পাথর ছিল বসার জায়গা। এখনো আছে। সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল টিলার উপর থাকা সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ-১ এর টাওয়ার গুলো। অই টাওয়ার গুলোর নিচে বিশাল বড় স্লাব ছিল। ঢালের নিচে ঐ স্লাবে এবং শুকনো ড্রেনে বসে পড়লে আর কেউ দেখত না। খুব নিরাপদ জায়গা স্কুল পালিয়ে যাওয়ার জন্য।
এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও। সন্ধ্যা নামলে যখন অন্ধকার বাড়ে, তখন ইতিহাসের অন্ধকার নামার স্মৃতি চারণ বঞ্চিত হতে পারেনা। এলাকার প্রবীণ মুরব্বি এবং স্থানীয় শ্রদ্ধেয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শুনেছি,১৯৭১ সালের মে মাসে সিলেট থেকে পাকবাহিনী প্রথমে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সার কারখানা চত্বরে ঢুকে কারখানার প্রথম ফটকে ২ জন মালিকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর পাকবাহিনী মনিপুর চা কারখানায় ঢুকে ২ জন শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে। হানাদার বাহিনীর হাতে আছকরের বড় ছেলে ফেঞ্চুগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আসাদুজ্জামান বাচ্চু প্রথম শহীদ হন। জানা যায়, হানাদাররা ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা অতিথি ভবন ও মনিপুর চা-বাগানের ঘাঁটিতে চালাতো নারী নির্যাতন।
চা বাগানের পাশেই ঐতিহ্যের ধারক ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা। একজন বিদেশী সাংসদ এবংমন্ত্রী, যার নাম তাকাশি হাওয়াকাওয়া তিনি জাপানের সাবেক মন্ত্রী তার স্মৃতিচারণ বই 'বাংলাদেশ', অনুবাদ প্রথমা প্রকাশন লিখেছিলেন- 'সেই সময় ফেঞ্চুগঞ্জ শহর পরিদর্শনে যাওয়ার সুযোগ হয়, যেখানে জাপানের ইঞ্জিনিয়াররা একটি সারকারখানা গড়ে তুলেছিলো, সেখানে যাবার পর সেখানের নাগরিক আমাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলো"।
আমি মনিপুর চা বাগানের কথা বলছি। সিলেটে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মনিরপুর চা বাগান বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম চা বাগান বলা যায়। ব্যাক্তিমালিকানাধীন এই চা বাগানের শান্ত স্নিগ্ধ সবুজের প্রকৃতি আমাকে আন্দোলিত করে বারবার। সিলেট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে আমাদের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায়। এর মধ্যে আমাদের মনিপুর চা বাগান এবং মোমিনছড়া চা বাগান বিশাল। মনিপুরের ভিতরে আরেকটি বাগান আছে মৌউয়াপুর চা বাগান। আমার কাছে হিসাব মতে ১৪০০ শ্রমিক রয়েছেন শুধু মনিপুর বাগানেই। এর মধ্যে ৭ শ জন পার্মানেট লেবার। হ্যাঁ হাজার হাজার চা শ্রমিক লেবারের জীবন ধারা মিশে আছে এই চা বাগানের। ছিপছিপে কালো শ্যামলা গড়নের এই মানুষগুলোর সাথে আমার ভালোবাসা বহমান হৃদয়ের চা ফুলেই।
স্মৃতিচারণের পাশাপাশি কিছু তথ্য জুড়ে দিলাম যেনো মনের আলপনার সাথে তথ্যগুলো পাখা মেলে চা বাগানে আনাচে কানাচেথাকা পাখির মত। কুহু কুহু শব্দে, পাহাড়ি ছড়ার স্বচ্ছ্ব পানির সাথে প্রথম পর্ব বয়ে যাক এভাবেই। সন্ধ্যে নামার এখনো অনেক বাকী আছে। আরও দুটি পর্বে নামবে সন্ধ্যা, মেঁঠো পথে ঘুরে বেড়াবে আমার নস্টালজিয়া। ১২ বাই ১২ ফুটের ঘরে চা শ্রমিকদের সন্ধ্যের সাথে মিলবো দ্বিতীয় পর্বে।
লেখকঃ চৌধুরী মারূফ অমিত, সাংবাদিক

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন