সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বই: সমসাময়িক এবং স্মৃতি থেকে

বই, এই শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। সবাই জানি, সবাই চিনি। কত ধরনের বই আছে। পাঠ্য বই, কবিতার বই, গল্পের বই, মজার বই, পাঞ্জেরী গাইড বই, ব্যাংকের চেক বই ইত্যাদি কত কিছুই না বই। বই শব্দটা শুনলেই, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে বছরের প্রথমে স্কুল থেকে পাওয়া একপাশে সেলাই, গাম দিয়ে লাগানো, চকচকে মলাটের , সুন্দর ঘ্রাণে ভরপুর বইগুলোকে যত্ন করার কথা বারবার মনে পড়ে। এ জন্য সৈয়দ মুজতবা আলী হয়তো বলেছিলেন, "রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত- যৌবনা- যদি তেমন বই হয়" শুধু তাই নয়, শার্টের বোতামের ভেতর বই বুকে চেপে দৌড়ে দৌড়ে স্কুল পালানোর স্মৃতিটাও ভুলে যাবার নয়।
আসলে কথা বলছি স্কুল পালানো নিয়ে নয়, বই নিয়ে। বই পড়া মানেই এক সময় মনে করতাম চাচা চৌধুরী কমিক্স আর মিনা মিতুর বই। পরে শুরু করলাম তিন গোয়েন্দা। সেই থেকে বই পড়ার নেশা। কিন্ত ক্লাসের পাঠ্য বইকে মনে হত যম। মাধ্যমিকে উঠার পর পদার্থ রসায়ন শুনলেই বুক কাঁপত, আবার ধর্ম শিক্ষা, বাংলা বই, সামাজিক বিজ্ঞান বই হাতে নিয়েই বলতাম একদম পাশ। মনে প্রেম ভালোবাসা রোমান্টিকতা জন্মানোর পরে ভালো লাগা শুরু হল কবিতা। কবিতার বই কাছে থাকলে নিজেকে মনে হত এই হয়ত চাঁদর পরা রবি ঠাকুর হয়ে গেলাম। একটু চুল লম্বা হয়ে গেলে ত কোন কথা নেই। ইদানিং আবার পলিটিক্যাল বই ছাড়া অন্য কোন কিছুই তেমন পড়া হয়না। ডিজিটাল সিস্টেমে আবার মোবাইলে পিডিএফ পড়তেও খারাপ লাগেনা। এগুলো হচ্ছে আমার বই সমাচার।
আজকে বই দিবস, এপ্রিলের ২৩। তাই বই নিয়ে কথা বলছি। ১৯৯৫ সাল থেকে পালন করা হয় বই দিবস। মূলত, বিশ্ব বই দিবসের মূল ধারণাটি আসে স্পেনের লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেসের কাছ থেকে। ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল মারা যান স্পেনের আরেক বিখ্যাত লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেস। আন্দ্রেস ছিলেন তার ভাবশিষ্য। নিজের প্রিয় লেখককে স্মরণীয় করে রাখতেই ১৯২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে আন্দ্রেস স্পেনে পালন করা শুরু করেন বিশ্ব বই দিবস। এরপর ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে বিশ্ব বই দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পালন করতে শুরু করে। সে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বই দিবসে আরেকটু অন্যভাবে চিন্তা করছি। বই বাঁধাই করা একটা শিল্প। খালি গাম, আঠা আর সূচ দিয়ে সেলাই করলেই যে বই বাঁধাই হয়ে গেলো তা কিন্তু নয়। হাতের একটি বিশেষ ভঙ্গিমা না থাকলে বই বাঁধাই করা যায় না। শৈশবে কেউ যদি ঘরের বই বাঁধাই করতে পারতো তবে সে বাবার কাছ থেকে প্রতি বই বাঁধাই এর জন্য পরিবারের বাবা, মা বা বড় ভাই বোনের কাছ থেকে একটাকা করে পেতো। আমিও পেতাম। ১০ টা বই বাঁধাই করে ১০ টাকা পেয়ে অনেক শখ করে একটি জেল পেন কিনতাম। সেটা আবার রাখতাম খুব যত্ন করে। শুধু কুটেশন বা মার্কিং এর জন্য ব্যভ্যার করতাম সেই কলম। আজ এসব খুব মিস করি।
এবার একটু সমসাময়িক কথা বলি। পাল্টেছে সময়, পাল্টেছে অভ্যাস। মনে হতে পারে, বইয়ের চেয়ে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে ফেসবুকের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই তরুণদের অভ্যাস এখন। আমার নিজেরো অভ্যাস। ইদানিং একটু কম, যদিও তা মাইগ্রেনের সমস্যার কারণে। প্রযুক্তির সঙ্গে নিবিড় বসবাস কেড়ে নেয় মানুষের অনেকটা সময়। কত দিন হলো পোস্ট অফিসের দিকে পা বাড়াই না আমরা! কত দিন হলুদ খামে চিঠি দেয়নি কাছের কোনো মানুষ। এখন তো প্রয়োজনে ছোট্ট একটা এসএমএস—ব্যাস! দুরু দুরু বুকে চিঠির জন্য অপেক্ষার দিন শেষ! আসলে আমরা কি নিজে পড়ছি বই। খুব পড়া হচ্ছে আগের তুলনায়। না, অন্যদের খবর জানিনা, তবে আমার হচ্ছে না। একটা সময় আমরা যখন ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়তাম এখন সেটা হচ্ছে না। আজকের ছেলে মেয়েরা বই পড়ে খুবই কম। বই কেনার নেশা আজ কমে গেছে। আর যদিও বই কেনে কেউ কেউ সেটা রেখে দেওয়া হয় শ পিছ হিসেবে। হারাচ্ছে কমিক্স, গোয়েন্দা বা গল্প পড়ার রীতি। বিগত কয়েকবছর থেকেই দেখছি, এটা জায়গায় যদি বাণিজ্য মেলা হয় তবে সেখানে হুমড়ি। কিন্তু কোন একটা জায়গায় বই মেলা হলে মানুষ নাই পাঁচজন। আমি অন্যদের না আমার কথাই বলি, একটা নতুন ব্র্যান্ডের ঘড়ি কেনার জন্য বাণিজ্য মেলায় চলে যাই, কিন্তু একজন রমা চৌধুরীর একটি বই সময়মত কিনতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা, আমাদের ব্যর্থতা। এই জায়গাটা বা এসব আমরা কিভাবে পূরণ করব বা আমি পূরণ করব তা আমাকে ভাবায়!
যাই হোক, সবশেষে বলছি আজ বিশ্ব বই দিবস। বই হোক সার্বক্ষনিক সঙ্গী। বই হোক রেফারেন্স। বই থাকুক ব্যাগে, সুযোগ পেলেই সেটা হয়ে যাক পড়া বা সময় কাটানোর বিষয়। আগামী প্রজন্মকে বই পড়তে, বই কিনতে উৎসাহিত করা হোক। লিখেছেন- মারূফ অমিত

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...