লিখেছেন- চৌধুরী মারূফ, সাংবাদিক
আমাদের শৈশবে ঈদ ছিল শীতের সময়। ডিসেম্বর এর শেষ বা জানুয়ারির দিকে। প্রচণ্ড শীত থাকতো। কোরবানি ঈদের দশ পনেরো দিন আগে থেকেই বাবার সাথে বায়না, পশুর হাঁটে নিয়ে যেতে হবে। একবার আমাদের পাশ্ববর্তী মুন্সিবাজারে গিয়েছিলাম পশুর হাঁটে। গরুর গোবরে পা পিছলে পড়ে যা'তা অবস্থা। বাবা রেগে গিয়ে বললেন - "না করছিলাম আইতো না, হারমাদ হারাম যদি আমার কথা হুন্ত"। সিলেটি ভাষায় বাবার সেই রাগ আজ হাহাকার করে খোঁজে বেড়াই।
আমাদের ঠিক সামনের প্রতিবেশিরা হিন্দু ধর্মের ছিলেন। সুশান্তদের বাসা। তাদের বা দুই বাসা পরে প্রদীপদের যাতে প্রব্লেম না হয় আমাদের বাসার পাশের পাহাড়ি খালের পারে ব্যবস্থা করা হতো কোরবানির। একবার ঈদের দিন তাড়াহুড়া করে কোরবানি দেখতে যাব, বয়স আমার চার বা পাঁচ। গরুর রক্তে স্লিপ করে সাদা পাঞ্জাবি একবারে কালারফুল লাল। বাবা একবারে ঘাড়ে ধরে পাখির মত বাসায় নিয়ে এসে থাপ্পড়। " তরে না করছিলাম যাইতে, কোরবানি দেকরার গরো দেকরা, আনামাতি গরো বৈ র। ১ হাজার টেখার পাইঞ্জাবি বিনালে গেলো"। আহ, আজ এসব কথা বলার কেউ নাই।
আমাদের বাসায় একজন কাজের বুয়া ছিলেন।উনার নাম ছিল ডলি। উনাকে বড়পা (বড় আপা) ডাকতাম। উনি লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু বাংলা ছায়াছবি দেখার জন্য খুবই উন্মাদ ছিলেন। ঈদের সাত অথবা আঁট দিন থেকে উনাকে লিস্ট করে করে শিখাতাম ঈদের সাত দিন কি কি নাটক, ছায়াছবি আর গানের প্রোগ্রাম দেবে। উনার'ও বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত, সেই মধুর সময় হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে।
একবার মনে আছে, ঈদের দুই তিন আগে, মা যেন পাশের বাসার আন্টিকে ঈদের ড্রেসাপ বের করে দেখাই ফেলছেন। সে কি কান্না। আমাদের ঈদ চলে গেসে। এখন বাজার থেকে নতুন কাপড় কিনে দিতে হবে, আমাকে নিয়ে যেতে হবে। আসলে কাপড় কেনা নয়, বাজারে রাতের বেলা ঘুরব এটাই মূল কাহিনী। সেই শৈশব থেকে বাজারে রাতে ঘুরতে আমার পছন্দ। বাবা বলতেন বড় হলে বখাটে হবো, এখন বলেন " যাই হোক আমার ছেলে লাইনে আছে, বেলাইনে যায় নাই।"
দল বেঁধে কোরবানির গরু কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মাঠে নিয়ে যাওয়া, ছোট ছোট প্যাকেটে করে ঈদের দিন পাড়া প্রতিবেশির বাসায় মাংস দিয়ে আসা, বা সকালে সেমাই নিয়ে শুশান্ত বা পাশের বাসার দাদুর ঘরে দিয়ে আসা সেইসব আজ স্মৃতি। আর যৌবনে পা দেবার পর সারাদিন মেডিক্যাল এর কোণায় আড্ডা, ফাঁকে ফাঁকে একটু কম অবস্থার মানুষ আসলে তাকে কিছু মাংস তুলে বা সংগ্রহ করে দিয়ে সহযোগিতা করা, ক্লিনারদের সাথে বাগান এবং কোরবানির জায়গা পরিষ্কার করা, দুলালের দোকানের চা, মামুন ভাই এর দোকানে ঈদের দিন ও বাকীতে ব্ল্যাক সিগারেট খাওয়া সেইসব সব স্মৃতি। চোখের সামনে ভাসছে ঈদের দিন বাসার পানির হাউজে দুইভাইয়ের একসাথে গোসল, মা'কে পুডিং মুখে তোলে খাইয়ে দেওয়ার স্মৃতি। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর বাসার সবাইকে প্রিয় এলাকা, প্রিয় চাবাগান দেখিনা।
আজ অনেক দূরে পরিবার পরিজন থেকে। প্রিয় এলাকা থেকে। জীবনের বাস্তবতায় এখন সবকিছু নিজে নিজেই করতে হয়। বাবা'ও কিছু বলেন না, মা'ও কাছে নেই। সবকিছু ছাপিয়ে উৎসবের দিনগুলোতে মন পড়ে থাকে প্রিয় বাংলাদেশের মাটিতে। সবাই সুস্থ থাকুন।
ছবিঃ লেখক
আমাদের শৈশবে ঈদ ছিল শীতের সময়। ডিসেম্বর এর শেষ বা জানুয়ারির দিকে। প্রচণ্ড শীত থাকতো। কোরবানি ঈদের দশ পনেরো দিন আগে থেকেই বাবার সাথে বায়না, পশুর হাঁটে নিয়ে যেতে হবে। একবার আমাদের পাশ্ববর্তী মুন্সিবাজারে গিয়েছিলাম পশুর হাঁটে। গরুর গোবরে পা পিছলে পড়ে যা'তা অবস্থা। বাবা রেগে গিয়ে বললেন - "না করছিলাম আইতো না, হারমাদ হারাম যদি আমার কথা হুন্ত"। সিলেটি ভাষায় বাবার সেই রাগ আজ হাহাকার করে খোঁজে বেড়াই।
আমাদের ঠিক সামনের প্রতিবেশিরা হিন্দু ধর্মের ছিলেন। সুশান্তদের বাসা। তাদের বা দুই বাসা পরে প্রদীপদের যাতে প্রব্লেম না হয় আমাদের বাসার পাশের পাহাড়ি খালের পারে ব্যবস্থা করা হতো কোরবানির। একবার ঈদের দিন তাড়াহুড়া করে কোরবানি দেখতে যাব, বয়স আমার চার বা পাঁচ। গরুর রক্তে স্লিপ করে সাদা পাঞ্জাবি একবারে কালারফুল লাল। বাবা একবারে ঘাড়ে ধরে পাখির মত বাসায় নিয়ে এসে থাপ্পড়। " তরে না করছিলাম যাইতে, কোরবানি দেকরার গরো দেকরা, আনামাতি গরো বৈ র। ১ হাজার টেখার পাইঞ্জাবি বিনালে গেলো"। আহ, আজ এসব কথা বলার কেউ নাই।
আমাদের বাসায় একজন কাজের বুয়া ছিলেন।উনার নাম ছিল ডলি। উনাকে বড়পা (বড় আপা) ডাকতাম। উনি লেখাপড়া জানতেন না, কিন্তু বাংলা ছায়াছবি দেখার জন্য খুবই উন্মাদ ছিলেন। ঈদের সাত অথবা আঁট দিন থেকে উনাকে লিস্ট করে করে শিখাতাম ঈদের সাত দিন কি কি নাটক, ছায়াছবি আর গানের প্রোগ্রাম দেবে। উনার'ও বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত, সেই মধুর সময় হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে।
একবার মনে আছে, ঈদের দুই তিন আগে, মা যেন পাশের বাসার আন্টিকে ঈদের ড্রেসাপ বের করে দেখাই ফেলছেন। সে কি কান্না। আমাদের ঈদ চলে গেসে। এখন বাজার থেকে নতুন কাপড় কিনে দিতে হবে, আমাকে নিয়ে যেতে হবে। আসলে কাপড় কেনা নয়, বাজারে রাতের বেলা ঘুরব এটাই মূল কাহিনী। সেই শৈশব থেকে বাজারে রাতে ঘুরতে আমার পছন্দ। বাবা বলতেন বড় হলে বখাটে হবো, এখন বলেন " যাই হোক আমার ছেলে লাইনে আছে, বেলাইনে যায় নাই।"
দল বেঁধে কোরবানির গরু কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মাঠে নিয়ে যাওয়া, ছোট ছোট প্যাকেটে করে ঈদের দিন পাড়া প্রতিবেশির বাসায় মাংস দিয়ে আসা, বা সকালে সেমাই নিয়ে শুশান্ত বা পাশের বাসার দাদুর ঘরে দিয়ে আসা সেইসব আজ স্মৃতি। আর যৌবনে পা দেবার পর সারাদিন মেডিক্যাল এর কোণায় আড্ডা, ফাঁকে ফাঁকে একটু কম অবস্থার মানুষ আসলে তাকে কিছু মাংস তুলে বা সংগ্রহ করে দিয়ে সহযোগিতা করা, ক্লিনারদের সাথে বাগান এবং কোরবানির জায়গা পরিষ্কার করা, দুলালের দোকানের চা, মামুন ভাই এর দোকানে ঈদের দিন ও বাকীতে ব্ল্যাক সিগারেট খাওয়া সেইসব সব স্মৃতি। চোখের সামনে ভাসছে ঈদের দিন বাসার পানির হাউজে দুইভাইয়ের একসাথে গোসল, মা'কে পুডিং মুখে তোলে খাইয়ে দেওয়ার স্মৃতি। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর বাসার সবাইকে প্রিয় এলাকা, প্রিয় চাবাগান দেখিনা।
আজ অনেক দূরে পরিবার পরিজন থেকে। প্রিয় এলাকা থেকে। জীবনের বাস্তবতায় এখন সবকিছু নিজে নিজেই করতে হয়। বাবা'ও কিছু বলেন না, মা'ও কাছে নেই। সবকিছু ছাপিয়ে উৎসবের দিনগুলোতে মন পড়ে থাকে প্রিয় বাংলাদেশের মাটিতে। সবাই সুস্থ থাকুন।
ছবিঃ লেখক
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন