অফিস পৌঁছতে পৌঁছতে ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁই-ছুঁই। অফিস পৌঁছেই তার চোখ টেবিলের ডান কোণায়। এক গাদা ফাইল হাজির ডাটা তৈরির জন্য। কোনও কথা না বলে টেবিলে বসে শার্টের হাতা গুটিয়েই কাজ শুরু।
মিরপুর ১০ নম্বরে বসবাস করেন একজন গো-বেচারা, নাম মুকিত খান,সরকারি চাকুরীজীবী। সাভার তার কর্মস্থল। যৌথ পরিবার নিয়ে ছয় তলা বিল্লিং এর চার তলায় তার বসবাস। বিয়ে করেছেন আট বছর হলো। ছেলে পুলে নেই। অন্যদের মধ্যে মা, দুই বোন এবং ছোট ভাইয়ের বউ। ছোট ভাই কানাডায় থাকে। এক বোনের বিয়ে হয়েছে তিন মাস। খুব সাদামাঠা জীবন যাপন করেন। আধো ময়লা সাদা ফুলহাতা শার্ট, রং জ্বলা কালো প্যান্ট, পুরনো বাটা জুতা পরে লাল চা আর বিস্কিট খেয়ে প্রতিদিন সকাল সাতটা বিশে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন।
এদিকে মিসেস মুকিত, শিল্পীর ঘুম ভাঙ্গতেই ঘড়ির দিকে তাকালো , দশটা একত্রিশ। ওড়নাটা বুকে দিয়ে আস্তে আস্তে মাথার চুল ঠিক করলেন। তারপর হাঁক ছাড়লেন ননাশ নিদুর
উদ্দেশ্যে।
শিল্পীঃ নিদু, এক কাপ চা নিয়ে আয় তো ।
নিদুঃ ভাবী রেডি হচ্ছি। ভার্সিটিতে যাবো। তুমি কষ্ট করে করে খেয়ে নাও।
এই বলেই কড়া পারফিউম ব্যবহার করে ওড়নাটা বুকের একপাশে ফেলে নিদু বেরিয়ে পড়লো।
মিসেস মুকিত কিছু না বলে কমর দুলিয়ে দুলিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন রাবেয়া আলু ভাজি করছে। মুখ যেন তার শ্রাবণের মেঘলা দুপুর।
শিল্পীঃ কি হয়েছে রে?
রাবেয়াঃ কি আর হবে, যা হবার তাই! প্রতিদিন একা একা চুলার পাশে নাস্তা তৈয়ার করো। এই বাড়িতে এসে মহাপাপ করেছি, সবাই ১০ ১১ টা পর্যন্ত ঘুমুচ্ছে, আর আমি একা একা ......, একবার মনে হয় সব ফেলে চলে যাই।
শিল্পীঃ মুখ বিকৃত বলে উঠলো; তো আমি কি করতে পারি, যা ইচ্ছা তা‘ই করো, চলে গেলে চলে যাও, কে গেলো- আর কে এল তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
এই বলে ঝন ঝন আর ঠাস ঠাস বাসনের শব্দ করে এক কাপ চা করেই নিজ রুমে চলে গেলো শিল্পী। যাবার সময় বলে গেলো
“কেউ যাবার হলে এখনি চলে যেতে পারে, হুহ”।
প্রচণ্ড রাগে দুঃখে চোখের পানি এমনিতেই বেরিয়ে এলো রাবেয়ার।
কাউকে কিছু না বলে নিজের কাজ চালিয়ে গেলো। এদিকে
কাজের বুয়া মুকিত সাহেবের রুম ঝাড়ু দিতে লাগলো। মিসেস মুকিত ভালো করে ঘর ঝাড়ু দেবার কথা বলে উপরের ফ্লাটে চলে গেলো আড্ডা দিতে। এদিকে দুপুর বেলা নিদু ফিরে এলো। তরাতরি স্নান সেরে এসে, ভিজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ছোট ভাবীকে জিজ্ঞেস করলো রান্না হয়েছে কি না?
শিল্পীর কথায় জমাকৃত রাগ ঝাড়ার জন্য রাবেয়া ঝাড়ি দিয়ে বলে উঠলোঃ আমি কারো রাখা কাজের বুয়া নই যে, যে সবার কাজ আমাকে করে দিতে হবে। ইচ্ছে হলে নিজে রান্না করে খেয়ে নাও, হুহ।
রেবেয়ার কথা শুনে নিদু চোখ বড় বড় করে বলে উঠলোঃ ভাবি, এতো বড়ো কথা তুমি বলতে পারলে? বলেই হু হু করে কেঁদে ভেক্টর গতিতে নিজের বিছানায় লুটিয়ে পড়লো। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মুকিত সাহেবের মা ধীর গতিতে এলেন। তিনি আগে থেকেই জানতেন কি হতে পারে। তারপরও ছোট বউ কে একবার জিজ্ঞেস করতেই রাবেয়া যা ইচ্ছা তাই বলে ফেললো। অপমানে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে। এদিকে শিল্পী বাসায় চলে এসে চেঁচামেচি শুনতে পেলো। রান্না ঘরের দিকে এগুতেই দেখলো মা বেরিয়ে গেলেন। রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলোঃ আপনাকে আর নাক গলাতে হবে না, আপনি আজ উপরে থেকে গেলেই পারতেন।
মুখ বিকৃতো করে শিল্পী বললোঃ মানে?
রাবেয়াঃ মানে আপনাকে উপরের ফ্লাটে থেকে যাবার জন্য বলছি ।
এই বলে রাবেয়া অর্ধেক রান্না ফেলেই রান্না ঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লক করে দিলো। সেদিন দুপুরে আর কারোর’ই খাওয়া হলো না।
এদিকে কাজের ঘোরে মগ্ন মুকিত সাহেব হটাৎ চেইনে জং ধরা হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। ২:৪৯। কলমটা ফাইলের ভিতর রেখে অফিসের বাইরে এলেন। সোজা চলে গেলেন রাস্তার ধারের ঐ টং দোকানে। এক প্লেট খিচুড়ি খেয়ে আর এক কাপ চা খেলেন। তারপর সিগারেট ধরিয়ে চলে এলেন অফিসের সামনে। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। পুনরায় অফিসে ঢুকেই কাজ শুরু। চারটা আঁট এ অফিস থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। এরই মধ্যে বাস চলে এলো। প্রচণ্ড ভীড়। ঠেলাঠেলি করে কুনো মতে দাঁড়ালেন। গাবতলিতে প্রচণ্ড যানজট। টেকনিক্যাল পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ৭.২০। নেমে হেঁটে হেঁটেই চলে এলেন জনতার সামনে। বাসার জন্য টুকিটাকি সওদা খরচ করবেন বলে। এর’ই মধ্যে সেল ফোনের রিং বেজে উঠলো। অফিসের বস কল দিয়েছেন।
মুকিত সাহেবঃ জি স্যার, বলুন?
বসঃ মুকিত সাহেব আপনাকে একটা জরুরী ইনফরমেশন জানাতে কল করেছি। আগামী কালের মধ্যেই আপনাকে বাহাত্তরটা প্রডাকশন ইনফরমেশন ফাইল তৈরি করে দিতে হবে। কাল আঁট টার আগেই অফিসে চলে আসবেন।
মুকিত সাহেবঃ জি, স্যার।
বস ফোন কেটে দিলেন। মুকিত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সওদা খরচ নিয়ে আঁটটা পঁচিশে বাসায় ফিরে এলেন। বাসায় ঢুকতেই যেন গুমট পরিবেশের আভাস পেলেন। নিদু মুখ কালো করে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে তার ফোঁটা ফোঁটা পানি। গালে হাত দিয়ে মা টেবিলের বাম পাশে চেয়ারে বসে আছেন। রেবেয়ার ঘরের দরজা লাগানো। কিছু বলার আগেই মা পাশে ছুটে এসে বললেনঃ “তোদের পেটে ধরেছি বলে কি আজ আমাকে এতো বড় কথা শুনতে হবে?”
মুকিত সাহেবঃ কি হয়েছে মা?
মা কিছু না বলেই চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন? মুকিত সাহেব কুনো মতে জুতা খুলে নিদুর কাছে গিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই হাউ মাউ করে নিদু কেঁদে বললোঃ “ভাইয়া, ছোটো ভাবি আমাকে এতো বড়ো কথা বলতে পারলো?” এরই মাঝে রাবেয়া ঠাস করে দরজা খুলে বলে উঠলোঃ “ভাইয়া, আমি ওর সাথে কথা বলেছি, কাল’ই মাসুম এসে আমাকে নিয়ে যাবে। আপনাদের এখানে এতো বড়ো বড়ো কথা শুনার জন্য আসিনি।”
কিছু না বুঝে শার্টের ইন খুলে খুলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রুমে ঢুকতেই দেখলেন বিছানায় বসা শিল্পীর চোখ দুটো লাল, ফোলা। কিছু বলার আগেই শিল্পী বলে উঠলোঃ “তোমার ঘরে আছি বলে আমাকে এতো বড়ো বড়ো কথা শুনতে হবে, বলেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো”
সেদিন বাসায় চুলোতে আদৌ আগুন জ্বলেছে কিনা তাতে সন্ধিহান থেকেই ক্ষুধার্ত ক্লান্ত দেহ নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন মুকিত সাহেব। তার আর জানা হলো না মা-বোন-বউ-বউ মা’র “এতো বড়ো কথা” টা কি .....................!
[[গল্পটি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছি। একজন প্রথা বিরোধী হিসেবে চিন্তা করলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অত্যাচারিত নারীদের পাশাপাশি কিছু নিরীহ গো-বেচারা পুরুষও মানসিক ভাবে অত্যাচারিতো হচ্ছেন নারী নামক কিছু পরিমিত সংখ্যক কচু বনের কালা চাঁদের দ্বারা। মানসিক ভাবে নির্যাতিত এইসব পুরুষ কাউকেই মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারেন না, আবার সহ্য’ ও করতে পারেন না। দিনের পর দিন তারা মানসিক ভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন যা এই সমাজ ব্যবস্থার পর্দার অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। পরিমিত আধা খেঁচড়া পাকানো নারীদের জন্যই পারিবারিক অশান্তি সর্বদা বেড়েই যাচ্ছে, পাশাপাশি বিবাহ বিচ্ছেদের মতো নেক্কার জনক ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে গাণিতিক হারে, আমি মনে করি পারিবারিক কলহ সৃষ্টিতে শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষ নয় বরং নারী-পুরুষ উভয়’ই সমান ভাবে দায়ী।
(কোন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে লিখার চরিত্র মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়)
লেখক- চৌধুরী মারূফ, সাংবাদিক, অনলাইন এক্টিভিস্ট
মিরপুর ১০ নম্বরে বসবাস করেন একজন গো-বেচারা, নাম মুকিত খান,সরকারি চাকুরীজীবী। সাভার তার কর্মস্থল। যৌথ পরিবার নিয়ে ছয় তলা বিল্লিং এর চার তলায় তার বসবাস। বিয়ে করেছেন আট বছর হলো। ছেলে পুলে নেই। অন্যদের মধ্যে মা, দুই বোন এবং ছোট ভাইয়ের বউ। ছোট ভাই কানাডায় থাকে। এক বোনের বিয়ে হয়েছে তিন মাস। খুব সাদামাঠা জীবন যাপন করেন। আধো ময়লা সাদা ফুলহাতা শার্ট, রং জ্বলা কালো প্যান্ট, পুরনো বাটা জুতা পরে লাল চা আর বিস্কিট খেয়ে প্রতিদিন সকাল সাতটা বিশে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন।
এদিকে মিসেস মুকিত, শিল্পীর ঘুম ভাঙ্গতেই ঘড়ির দিকে তাকালো , দশটা একত্রিশ। ওড়নাটা বুকে দিয়ে আস্তে আস্তে মাথার চুল ঠিক করলেন। তারপর হাঁক ছাড়লেন ননাশ নিদুর
উদ্দেশ্যে।
শিল্পীঃ নিদু, এক কাপ চা নিয়ে আয় তো ।
নিদুঃ ভাবী রেডি হচ্ছি। ভার্সিটিতে যাবো। তুমি কষ্ট করে করে খেয়ে নাও।
এই বলেই কড়া পারফিউম ব্যবহার করে ওড়নাটা বুকের একপাশে ফেলে নিদু বেরিয়ে পড়লো।
মিসেস মুকিত কিছু না বলে কমর দুলিয়ে দুলিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন রাবেয়া আলু ভাজি করছে। মুখ যেন তার শ্রাবণের মেঘলা দুপুর।
শিল্পীঃ কি হয়েছে রে?
রাবেয়াঃ কি আর হবে, যা হবার তাই! প্রতিদিন একা একা চুলার পাশে নাস্তা তৈয়ার করো। এই বাড়িতে এসে মহাপাপ করেছি, সবাই ১০ ১১ টা পর্যন্ত ঘুমুচ্ছে, আর আমি একা একা ......, একবার মনে হয় সব ফেলে চলে যাই।
শিল্পীঃ মুখ বিকৃত বলে উঠলো; তো আমি কি করতে পারি, যা ইচ্ছা তা‘ই করো, চলে গেলে চলে যাও, কে গেলো- আর কে এল তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
এই বলে ঝন ঝন আর ঠাস ঠাস বাসনের শব্দ করে এক কাপ চা করেই নিজ রুমে চলে গেলো শিল্পী। যাবার সময় বলে গেলো
“কেউ যাবার হলে এখনি চলে যেতে পারে, হুহ”।
প্রচণ্ড রাগে দুঃখে চোখের পানি এমনিতেই বেরিয়ে এলো রাবেয়ার।
কাউকে কিছু না বলে নিজের কাজ চালিয়ে গেলো। এদিকে
কাজের বুয়া মুকিত সাহেবের রুম ঝাড়ু দিতে লাগলো। মিসেস মুকিত ভালো করে ঘর ঝাড়ু দেবার কথা বলে উপরের ফ্লাটে চলে গেলো আড্ডা দিতে। এদিকে দুপুর বেলা নিদু ফিরে এলো। তরাতরি স্নান সেরে এসে, ভিজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ছোট ভাবীকে জিজ্ঞেস করলো রান্না হয়েছে কি না?
শিল্পীর কথায় জমাকৃত রাগ ঝাড়ার জন্য রাবেয়া ঝাড়ি দিয়ে বলে উঠলোঃ আমি কারো রাখা কাজের বুয়া নই যে, যে সবার কাজ আমাকে করে দিতে হবে। ইচ্ছে হলে নিজে রান্না করে খেয়ে নাও, হুহ।
রেবেয়ার কথা শুনে নিদু চোখ বড় বড় করে বলে উঠলোঃ ভাবি, এতো বড়ো কথা তুমি বলতে পারলে? বলেই হু হু করে কেঁদে ভেক্টর গতিতে নিজের বিছানায় লুটিয়ে পড়লো। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মুকিত সাহেবের মা ধীর গতিতে এলেন। তিনি আগে থেকেই জানতেন কি হতে পারে। তারপরও ছোট বউ কে একবার জিজ্ঞেস করতেই রাবেয়া যা ইচ্ছা তাই বলে ফেললো। অপমানে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন রান্না ঘর থেকে। এদিকে শিল্পী বাসায় চলে এসে চেঁচামেচি শুনতে পেলো। রান্না ঘরের দিকে এগুতেই দেখলো মা বেরিয়ে গেলেন। রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলোঃ আপনাকে আর নাক গলাতে হবে না, আপনি আজ উপরে থেকে গেলেই পারতেন।
মুখ বিকৃতো করে শিল্পী বললোঃ মানে?
রাবেয়াঃ মানে আপনাকে উপরের ফ্লাটে থেকে যাবার জন্য বলছি ।
এই বলে রাবেয়া অর্ধেক রান্না ফেলেই রান্না ঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লক করে দিলো। সেদিন দুপুরে আর কারোর’ই খাওয়া হলো না।
এদিকে কাজের ঘোরে মগ্ন মুকিত সাহেব হটাৎ চেইনে জং ধরা হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। ২:৪৯। কলমটা ফাইলের ভিতর রেখে অফিসের বাইরে এলেন। সোজা চলে গেলেন রাস্তার ধারের ঐ টং দোকানে। এক প্লেট খিচুড়ি খেয়ে আর এক কাপ চা খেলেন। তারপর সিগারেট ধরিয়ে চলে এলেন অফিসের সামনে। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। পুনরায় অফিসে ঢুকেই কাজ শুরু। চারটা আঁট এ অফিস থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটা সিগারেট ধরালেন। এরই মধ্যে বাস চলে এলো। প্রচণ্ড ভীড়। ঠেলাঠেলি করে কুনো মতে দাঁড়ালেন। গাবতলিতে প্রচণ্ড যানজট। টেকনিক্যাল পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ৭.২০। নেমে হেঁটে হেঁটেই চলে এলেন জনতার সামনে। বাসার জন্য টুকিটাকি সওদা খরচ করবেন বলে। এর’ই মধ্যে সেল ফোনের রিং বেজে উঠলো। অফিসের বস কল দিয়েছেন।
মুকিত সাহেবঃ জি স্যার, বলুন?
বসঃ মুকিত সাহেব আপনাকে একটা জরুরী ইনফরমেশন জানাতে কল করেছি। আগামী কালের মধ্যেই আপনাকে বাহাত্তরটা প্রডাকশন ইনফরমেশন ফাইল তৈরি করে দিতে হবে। কাল আঁট টার আগেই অফিসে চলে আসবেন।
মুকিত সাহেবঃ জি, স্যার।
বস ফোন কেটে দিলেন। মুকিত সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সওদা খরচ নিয়ে আঁটটা পঁচিশে বাসায় ফিরে এলেন। বাসায় ঢুকতেই যেন গুমট পরিবেশের আভাস পেলেন। নিদু মুখ কালো করে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে তার ফোঁটা ফোঁটা পানি। গালে হাত দিয়ে মা টেবিলের বাম পাশে চেয়ারে বসে আছেন। রেবেয়ার ঘরের দরজা লাগানো। কিছু বলার আগেই মা পাশে ছুটে এসে বললেনঃ “তোদের পেটে ধরেছি বলে কি আজ আমাকে এতো বড় কথা শুনতে হবে?”
মুকিত সাহেবঃ কি হয়েছে মা?
মা কিছু না বলেই চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন? মুকিত সাহেব কুনো মতে জুতা খুলে নিদুর কাছে গিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই হাউ মাউ করে নিদু কেঁদে বললোঃ “ভাইয়া, ছোটো ভাবি আমাকে এতো বড়ো কথা বলতে পারলো?” এরই মাঝে রাবেয়া ঠাস করে দরজা খুলে বলে উঠলোঃ “ভাইয়া, আমি ওর সাথে কথা বলেছি, কাল’ই মাসুম এসে আমাকে নিয়ে যাবে। আপনাদের এখানে এতো বড়ো বড়ো কথা শুনার জন্য আসিনি।”
কিছু না বুঝে শার্টের ইন খুলে খুলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। রুমে ঢুকতেই দেখলেন বিছানায় বসা শিল্পীর চোখ দুটো লাল, ফোলা। কিছু বলার আগেই শিল্পী বলে উঠলোঃ “তোমার ঘরে আছি বলে আমাকে এতো বড়ো বড়ো কথা শুনতে হবে, বলেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো”
সেদিন বাসায় চুলোতে আদৌ আগুন জ্বলেছে কিনা তাতে সন্ধিহান থেকেই ক্ষুধার্ত ক্লান্ত দেহ নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন মুকিত সাহেব। তার আর জানা হলো না মা-বোন-বউ-বউ মা’র “এতো বড়ো কথা” টা কি .....................!
[[গল্পটি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছি। একজন প্রথা বিরোধী হিসেবে চিন্তা করলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অত্যাচারিত নারীদের পাশাপাশি কিছু নিরীহ গো-বেচারা পুরুষও মানসিক ভাবে অত্যাচারিতো হচ্ছেন নারী নামক কিছু পরিমিত সংখ্যক কচু বনের কালা চাঁদের দ্বারা। মানসিক ভাবে নির্যাতিত এইসব পুরুষ কাউকেই মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারেন না, আবার সহ্য’ ও করতে পারেন না। দিনের পর দিন তারা মানসিক ভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন যা এই সমাজ ব্যবস্থার পর্দার অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। পরিমিত আধা খেঁচড়া পাকানো নারীদের জন্যই পারিবারিক অশান্তি সর্বদা বেড়েই যাচ্ছে, পাশাপাশি বিবাহ বিচ্ছেদের মতো নেক্কার জনক ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে গাণিতিক হারে, আমি মনে করি পারিবারিক কলহ সৃষ্টিতে শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষ নয় বরং নারী-পুরুষ উভয়’ই সমান ভাবে দায়ী।
(কোন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে লিখার চরিত্র মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়)
লেখক- চৌধুরী মারূফ, সাংবাদিক, অনলাইন এক্টিভিস্ট

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন