সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বঙ্কিম চন্দ্রের 'বিড়াল' ও আজকের সমাজ ব্যবস্থা

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়।  তিনি বাংলা উপন্যাসের প্রথম সার্থক স্রষ্টা। 'সাহিত্যসম্রাট' হিসেবে পরিচিত বঙ্কিম বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ।  যারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বীয় কীর্তি দ্বারা অমর হয়ে অাছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় অন্যতম।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের হাস্য- রসাত্মক ও ব্যঙ্গধর্মী রচনার সংকলন ' কমলাকান্তের দপ্তর'। তিন অংশে বিভক্ত গ্রন্থটিতে যে কটি প্রবন্ধ রয়েছে তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য 'বিড়াল'।
একটি বিড়ালকে রুপক হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদ ও অধিকারকে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়৷

সাম্যবাদবিমুখ ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় বিড়ালের মুখ দিয়ে শোষক- শোষিত, ধনী -দরিদ্র, সাধু- চোরের অধিকারের কথা শ্লেষাত্মক, যুক্তিনিষ্ট ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন।

রচনার শুরুতে দেখা যায়, অাফিংয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে শয়নগৃহে চৌকির উপর বসে কমলাকান্ত ওয়াটার্লু যুদ্ধ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ বিড়ালের একটা 'মেও' শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে। কমলাকান্ত দেখেন তার জন্য প্রসন্ন গোয়ালিনীর রেখে যাওয়া দুধটুকু এই বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। কমলাকান্ত ভাবেন, দুধে তার নিজের যেমন অধিকার অাছে, তেমনি বিড়ালেরও সমান অধিকার। কারণ দুধ তার নয়, দুধ হলো গাভীর।  তবুও নিজের শ্রেষ্টত্ব প্রকাশের জন্য তিনি বিড়ালটিকে লাঠিপেটা করতে উদ্যোত হন।  এমন সময় দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে কমলাকান্ত বিড়ালের কথা শুনতে পান।  বস্তুত তাঁর নিজের বিবেকই বিড়ালের পক্ষে কথা বলে। বিড়াল এ সংসারের ক্ষীর, সর, দুধ, দই, মাছ, মাংসে তাদের অধিকারের কথা কমলাকান্তকে জানিয়ে দেয়। কারণ মানুষের মতো তাদেরও ক্ষুধা তৃঞ্চা অাছে।  বিড়াল বলে, ' খাইতে পাইলে কে  চোর হয়।  বিড়ালের মতে, তার চৌর্যবৃত্তির প্রধান কারণ ধনীদের কৃপনতা। ধনীরা তার খাবার ব্যবস্থা করলে সে চুরি করত না। চুরির কারনে যে অধর্ম হয় তার জন্য বিড়াল দায়ী করেছে ধনীকে।  বিড়ালের দাবি, ধনীর দোষেই দরিদ্র চোর হয়। ধনীরা দরিদ্রকে খেতে না দিলে দরিদ্র চুরি করেই যাবে। অার এ চুরির জন্য দরিদ্রের দণ্ডের বিধান সত্বেও কার্পন্যের জন্য ধনীদের দণ্ড না হওয়ায় বিড়ার প্রশ্ন তুলে। তার দাবি, চোরকে সাজা দেওয়ার অাগে বিচারককে তিনদিন উপোস করতে হবে। এতে যদি বিচারকের চুরি করে খাবার খেতে ইচ্ছে না করে তবেই যেন চোরের দণ্ড প্রদান করেন।

ক্ষুধা তৃঞ্চার অনুভূতি সকল প্রাণিই সমান অনুভব করে। ' বিড়াল' রচনায় বিড়ালের অনুযোগের মাধ্যমে লেখক চৌর্যবৃত্তির অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করেছেন।

এ রচনায় কমলাকান্ত ও বিড়ালের মধ্যে কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার কঠোর নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। যা অাজও সমাজে বিদ্যমান। ধনীরা গ্রাস করছে গরীবের সম্পদ। রচনায় বিড়ালের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে পৃথিবীর সব বঞ্চিত,  নিষ্পেষিত, দলিতের ক্ষোভ - প্রতিবাদ। বিড়ালের তীক্ষ্ণ যুক্তির কাছে কমলাকান্ত অনেকটাই পরাজিত হয়েছেন।

পৃথিবীর মানুষ কিছু লৌকিক অধিকার নিয়ে জন্মায়। এই অধিকারে হস্তক্ষেপ করা চরম নির্মমতা।  'বিড়াল' রচনায় বিড়ালের মতো শোষিত শ্রেণিকে ধনিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ধণিক শ্রেণির এমন অাচরনে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য বাড়তে থাকে।  তাই লেখক বিড়ালের জবানীতে ধনিক শ্রেণির এই অাচরনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সমাজে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

লেখকঃ অহী আলম রেজা, প্রভাষক এবং সাংবাদিক



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...