সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটি গান, একজন সাধক এবং রংপুরের কান্না

নীরব শান্ত রাত। বাইরে টুপটুপ বৃষ্টি। অগ্রহায়ণের রাত, কেউ বলেছেন নভেম্বর রেইন।  ঘুমে আচ্ছন্ন উত্তর গোলার্ধের মানুষ পরিজন। সুরে মেতে আছে মানসিকতা। দুইটা বই, কোল বালিশ পড়ে আছে পাশে। রেন্ডমে গান বেজে চলছে স্পিকারে সফট সাউন্ডে। বাউল সুনীল কর্মকারের বেহালার সুর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বেজে চলছে সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ'র গান। হঠাত করেই বেজে উঠলো "মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এ মন্ত্রণা কে দিয়াছে। " উঠে বসলাম। কথাটা খুব মনে ধরল। গান বেজেই চলছে --- 
//মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে ।। 
মানুষ ভজ কোরান খুঁজ পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে ।
খোদার নাইরে ছায়া-কায়া স্বরূপে ধরেছে মায়া
রূপে মিশাই রূপের ছায়া ফুল কলি ছয় প্রেমের গাছে ।।
আরবে মক্কারি ঘর মদিনায় রাসূলের কবর
বায়তুল্লাতে শূন্যের পাথর সকলি মানুষ কইরাছে।।
মানুষে কইরাছে কর্ম কতই পাপ কত ধর্ম
বুঝতে পাবি নিগুর মর্ম, মন-মহাজন মধ্যে আছে ।।
দিলের যখন খুলবে কপাট দেখবে তবে প্রেমেরও হাট
মারফতও সিদ্ধির ঘাট সকলি মানুষের কাছে ।।
সৃষ্টির আগে পরয়ারে মানুষেরি রূপ নেহারে
ফেরেশতারা যাইতে নারে মানুষ তথা গিয়াছে রে ।।
মানুষেরি সঙ্গ লইয়া পৃথিবীতে জন্ম হইয়া 
খেলতে হলে মানুষ লইয়া জাত বিনে কি জাতি বাচে ।।
মানুষেরি ছবি আক পায়ের ধুলো গায়ে মাখ 
শরীয়ত সঙ্গে রাখ তত্ত্ব বিষয় গোপন আছে ।।
জালালে কয় মন রে পাজি করলে কত বেলে হাজী 
মানুষ তোমার নায়ের মাঝি একদিন গিয়া হবে পাছে ।।

একটু বিশ্লেষণ করলাম কিছু কথা নিয়ে। একটু গভীর চিন্তা করলাম। খুব সহজে সাধক যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন মানুষের মাধ্যমেই সব কর্মই সম্পাদন হয়েছে, আসমান থেকে টুপ করে কিছু পড়ে যায়নি। সকল কর্মের মূল উৎসে রয়েছে মানুষ মহাজন। প্রথমেই বলা হয়েছে-  'মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে'। সোজা সাপ্টা কথা সাধক বলেছেন মানুষকে ভজা, মানুষে সাধন করা, করতে হবে।  কোন ধর্মীয় আলোচনায় যাচ্ছিনা, শুধু এতটুকুই উপলব্ধি করলাম,  বিশ্বব্যাপী যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে লিপ্ত এবং নির্দিষ্ট কোন ধর্ম বাস্তবায়নে যারা ঘোরের মধ্যে থেকে অবাধে নিরীহ আছে তারা কতটুকুই মেনে চলছে এ কথার মর্মফল! নির্দিষ্ট একজন সাধক বাউলকে নিয়ে খানিক কিছু লিখব, তাই তর্ক বিতর্কে না গিয়ে শুধু হাহাকার জমলো কথাটা শুনে। একটু বলি, সুনামগঞ্জের বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন, 'এই পৃথিবী একদিন বাউলের পৃথিবী হবে।' তার কথাটা মনে খুব ধরে, মনে প্রাণে মানি, বিশ্বাস করি, বাউলের পৃথিবী হলে এ পৃথিবীতে কন হানাহানি রক্তপাত থাকত না। মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে হত্যা করতে পারত না তার মত রক্ত মাংসের, তার মতই হাত পা চোখের অন্য মানুষকে। বেশি বলে অন্য প্রসঙ্গে কথা নিয়ে যাচ্ছিনা। 

সাধক পরবর্তীতে বলেছেন,  "খোদার নাইরে ছায়া-কায়া স্বরূপে ধরেছে মায়া রূপে মিশাই রূপের ছায়া ফুল কলি ছয় প্রেমের গাছে"। বোধকরি- নিজেকে দেখা, নিজেকে খোঁজা, নিজেকেই জানা হচ্ছে খোদাকে দেখা। খোদা কে কোথায় আছেন কিভাবে আছেন বিভিন্ন পথ, নীতি, বাক্য বিভিন্নভাবে ব্যাখা দিলেও মনে করি মানুষকে ভজা মানেই খোদাকে পাওয়া। নিজের রূপের সাথে নিজেকে মেলালেই হয়ত সেই খোদাকে পাওয়া যায়। সেই খোদা কোন আলৌকিক নিরাকার নন, বরং মানুষেই সাকার। সেটাই সাধক সুরে সুরে বলেছেন।  

সাধক বলে গেছেন, 'মানুষে কইরাছে কর্ম কতই পাপ কত ধর্ম- বুঝতে পাবি নিগুর মর্ম, মন-মহাজন মধ্যে আছে।' মানুষই সৃষ্টি করেছে সব। মত পথ নীতি বাক্য আচার কৃষ্টি ব্যভার ধর্ম। মানুষের পথচলায় মানুষই এসব তৈয়ার করেছে। আকাশ থেকে কোন ধর্ম এসে পড়েনি মাটিতে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যা আছে সবই মানুষের দ্বারা তৈয়ার হয়েছে, ব্যবহার হয়েছে। কোন হাস মুরগী লতা পাতা কৃষ্টি কর্ম বাস্তবায়ন করেনি,পালনই করি নি। সবই মানুষ করেছে। ভাল হোক মন্দ হোক এখানে মানুষের আধিপত্য, বিচরণ। কথাটায় সেটাই প্রমাণিত আমার কাছে যা মনে হয়।  

আমি সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ'র কথা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। প্রায় প্রতিদিন ই সাধক জালালের গান শুনা হয়। এর আগে একটু বলে নেই নেত্রকোণার বাউল সুনীল কর্মকারের মধ্যে আমি উস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁ'র প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। আমি জালাল খাঁ'কে দেখিনি। ছবিতে যা দেখেছি অনেকটাই আমার কাছে সুনীল কর্মকারের চেহারার মত মনে হয়। 

হ্যাঁ, বলছিলাম আমি সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ'র কথা।  উস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁ  নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আসদহাটি গ্রামে ১৮৯৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সদরুদ্দীন খাঁ। সাধক জালাল খাঁ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে নেত্রকোনা দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ সময় বাইশচাপড়া গ্রামের প্রখ্যাত বাউল-রশিদ উদ্দিনের বাড়িতে লজিং থাকতেন । ফলে রশিদ উদ্দিনের সংস্পর্শে এসে বাউল গানে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন । বাউল গানের প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যরা জালালকে কেন্দুয়ার একটি স্কুলে ভর্তি করে দেন । কিন্তু পড়াশোনায় আর মন বসেনি বালক জালালের । দশম শ্রেণীতে উঠে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন । ১৯১৭ সালে সিংহের গ্রামের হাসমত তালুকদারের মেয়ে রাবেয়া আক্তারকে ভালোবেসে বিয়ে করে সেখানেই ঘরজামাই হিসেবে থেকে যান । স্ত্রী ইয়াকুতুন্নেছার মৃত্যুর পর থেকেই জালাল খাঁর মধ্যে বৈরাগ্য ভাব দেখা দেয়। শুরু করেন আত্মসন্ধান ও সংগীত সাধনা। তিনি বিভিন্ন মাজারে চলাফেরা শুরু করেন এবং পীর, ফকির ও সাধকের সান্নিধ্য লাভ করেন। 

যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সৈয়দ খোয়াজ নামক একজন ধর্ম প্রচারক বৃহত্তর পূর্ব মোমেনশাহীতে আগমন করেন এবং বর্তমান কেন্দুয়ার উপজেলা আসদহাটি গ্রামে আস্তানা স্থাপন করে ধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন। মনাং গ্রামের মৃত্যু পথযাত্রী ব্রাহ্মণ উকিল শচীন শর্মা সর্বশেষ সৈয়দ খোয়াজ এর নিকট আসেন এবং সম্পূর্ণভাবে রোগমুক্ত হয়ে তাঁর নিকট বায়াত গ্রহন করেন। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েই উকিল ব্রাহ্মণ শচীন শর্মা “ সুলতান খাঁ ” নাম ধারন করেন এবং ঐ গ্রামেই বিবাহ করে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। মরমী কবি, গীতিকার ও বাউল কবি জালালউদ্দিন খাঁ উক্ত সুলতান খাঁর বংশের অষ্টম পুরুষ। বিচিত্র লোক-গীতির স্রষ্টা, পল্লীগীতি, মারফতি, দেহতত্ত্ব ও বিচ্ছেদ সঙ্গীত সমূহের বিশাল ভাণ্ডারের সৃজনে এবং সূফী ও সন্ন্যাস ধর্মীয় পথ প্রদর্শক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। 

জালাল খাঁ তাঁর দীর্ঘ জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গীতিকবিতা রচনা করেছেন। তাঁর রচিত ‘জালাল গীতিকা প্রথম খণ্ড’, ‘জালাল গীতিকা দ্বিতীয় খণ্ড’, ‘জালাল গীতিকা তৃতীয় খণ্ড’, ‘জালাল গীতিকা চতুর্থ খণ্ড’ ও ‘জালাল গীতিকা পঞ্চম খণ্ড’ নামে প্রকাশিত পাঁচটি গীতিকবিতার বই রয়েছে। এছাড়া তাঁর ‘বিশ্ব রহস্য’ নামে বহুল তত্ত্ব সমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধের বইও রয়েছে। ১৯৭২ সালের ৩১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ। 

সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ কে নিয়ে লিখলে আরো অনেক কিছু যায়। অল্পভাবে লিখার চেষ্টা করেছি। মূলত লিখার চেষ্টা করেছি সাধকের 'মানুষ থুইয়া খোদা ভজ এ মন্ত্রণা কে দিয়েছি' এই কথার উপর একটু কলম ঘুরাতে। আজকে পত্রিকার পাতা দেখুন, ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার প্রতিবেদন দেখুন, নিউজ পোর্টাল খুলুন প্রতিদিন বোমা হামলায় বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিহত। কখনো আমেরিকা, কখনো নাইজেরিয়া, কখনো সোমালিয়া, কখনো আফগানিস্তান, সিরিয়া ইরাক বা লিবিয়া। ধর্ম বাস্তবায়নের নামে হৈ হৈ করে চলছে মানুষ মারার পিশাচি কর্মকান্ড। এইতো সেদিন ফেসবুকে স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের রংপুরে কি ঘটে গেল! ভিনামতালম্বীদের প্রতি নেক্কারজনক আক্রমণ। বৃদ্ধা মহিলার আর্তনাদ করা ছবিটি দেখলে চোখে জল আসে। যার আইডিকে কেন্দ্র করে এত কিছু তার পরিবারের দাবী ঐ লোক ফেসবুক চালাতেই জানেনা। আবার একদলের অভিযোগ ইচ্ছা করেই এসব করা হচ্ছে, ঐ লোকই করেছে, ধর্ম অবমাননা করছে। আমি ভাবছি অই জায়গাতে, এক লোকের স্ট্যটাসের জিকির তুলে হামলা করায় কি হামলাকারীদের ধর্মের এলেম রক্ষে হয়েছে! এক বিশ্বাসকে বাঁচাতে অন্যকে মেরে ফেললেই সব সমাধান! মোটেও তা নয়, আমি তা মানিনা। এটা নতুন নয় প্রিয় বাংলাদেশে, এসব অনেক বার হয়েছে। আমরা দেখেছি রামু, দেখেছি নাসিরনগর। আমরা দেখেছি যারা বিশ্বাস করেন না কোন প্রচলিত ধর্মে আমরা তাদের রক্ত দেখেছি রাস্তায়। তার যুক্তির কারণে, তার প্রশ্ন উত্থাপনের হারাতে হয়েছে তার প্রাণ, চাপাতির আঘাতে ছিন্নবিন্ন হয়েছে তার মস্তক। কে কি মানবে না মানবে সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু মানা না মানার ব্যাপারে একজনকে মেরে ফেলাটাই কি সেই খোদা ভজনা! হামলা করাটা কি সলিট লাইসেন্স!  বিগত দিনের এই ব্যাপারগুলো তুলে ধরলাম আমি এই পয়েন্ট এর উপরে, আমি আবার বলছি আমি এত কিছু বলেছি এই পয়েন্টের উপরে- মানুষ ছাড়া খোদা ভজার মন্ত্রণা আমরা কোথায় পেলাম, তা যদি চিন্তা করতাম, ভাবতাম তবে অনেক প্রশ্নের সমাধান হত।

আমার কথার পক্ষে অনেকে হ্যাঁ বলবেন, আবার অনেকে না বলবেন, মানবেন না। এটাই স্বাভাবিক। একটা কথার উপর পয়েন্ট করতে গিয়ে অনেক কিছুই বললাম, একজন সাধকের পরিচয় দিলাম, আমি নিজে আরো গভীর ভাবে সাধকের সাথে পরিচিত হলাম। এখানে বলে রাখি, লেখাটিতে সম্পূর্ণভাবে আমি আমার ব্যক্তিগত চিন্তা তুলে ধরলাম, এবং আমি বিশ্বাস করি বাউলের সুরে যদি পৃথিবীর ছয়শ কোটি মানুষ সুর মেলাতো তবে সব জায়গায় এটাই লিখা থাকত সবার উপরে মানুষ সত্য, মানুষ'ই সত্য। উপরে লিখা এই একটি গানের কথাগুলোই সব হামলা রক্ত আগুন বন্ধ করে দিতে পারে যদি জালাল খাঁর এই একটি গানকেই হৃদয়ে ধারণ করা যায়। তার কথার সারমর্ম উপলব্ধি করা যায়। 

লিখেছেন: মারূফ অমিত, অনলাইন এক্টিভিস্ট 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...