সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গতিহারা বাম রাজনীতি

 দেশের বামপন্থি দলগুলোতে সাংগঠনিক দুর্বলতা চরমে। ফলত তারা গতিহারা হয়ে পড়েছে। গ্রুপিং-কোন্দল আর অন্তঃকোন্দলের শেষ নেই। ফলে রাজনীতির মাঠে সরকারকে বড় কোনো ধাক্কা দিতে পারছে না বাম দলগুলো। আবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের বাইরে বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিলেও, সেখানে মতভেদ চরমে। দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত পার্থকও কম নয়। ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনেও তাদের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাম জোট ছোট-বড় আন্দোলন করছে। দলগুলোর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত পার্থক্য আছে। এমনকি কোনো কোনো ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে নানা ধরনের টানাপোড়েন চলছে। ফলে মাহমুুদুর রহমান মান্না ও নুরুল হক নূরদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে কিছু বাম নেতার অংশগ্রহণ নিয়ে জোটের ভিতর ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়াও আছে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাম দলগুলোর কিছু সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সরকারকে বড় ধাক্কা দিতে পারছে না। তবে শাসক দলের জুলুম-অন্যায় ও অবিচারের কথা জনগণের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। এই যে পাটকলগুলো বন্ধ করার পর এখন চিনিকলগুলোও বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার প্রতিবাদে মাঠে সরব রয়েছে একমাত্র বামপন্থিরাই। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মতে, জনজীবনের প্রতিটি ইস্যুতে বামপন্থিরা সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে রাজপথে সোচ্চার ও সরব রয়েছে। তবে আমাদের সামর্থ্যরে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা টাকার রাজনীতি করি না। ফলে কর্মীরা নিজেদের সীমিত শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে রাজপথে সক্রিয় থাকেন। আছে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতাও। এরপরও দুর্যোগ, নিত্যদিনের সংকট আর মহামারীতে মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রশ্নে সবার আগে এগিয়ে আসেন বামপন্থিরা। জানা গেছে, জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সরব বাম দলগুলো। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে বাম দলগুলোর সোচ্চার প্রতিবাদ দেখেছে সাধারণ মানুষ। পাটকল ও গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের দাবি আদায়েও মাঠে সক্রিয় দলগুলো। তবে দেশে অনেক বাম দল থাকলেও রাজনীতির মাঠে সক্রিয় কেবল কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদ। জনগুরুত্বপূর্ণ দাবিতে রাজপথে দেখা মিলছে বামদের। দেশের বাম দলগুলোর একটি অংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে সংসদে আছে। আর অধিকাংশ বাম দলই নিষ্ক্রিয়। যদিও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গত কয়েক বছর যাবত বাম জোট রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় বাম দলগুলো। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সক্রিয় বাম জোট।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বি-দলীয় বৃত্তের রাজনীতির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই আত্মপ্রকাশ করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এই জোটে থাকা ৮টি দলের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লিগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। গত বছর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে একটা অংশ বেরিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্ক্সবাদী) নামে নতুন দল করে। এই দলটিও বাম জোটে যুক্ত হয়। জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কেবল কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এই জোটের শরিক কোনো দল থেকে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।


লিখেছেনঃ রুহুল আমিন রাসেল, কলামিস্ট,  রাজনৈতিক বিশ্লেষক 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...