সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রক্তে ধোয়া ১৪ ফেব্রুয়ারি, লাল সালাম



সময়টা ১৯৮৩। ১৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট এক দেয়ালে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মীরা লাল-কালো অক্ষরে বিদ্রোহ আর বেদনার মিশেলে লিখেছিল ‘দিপালী সাহার রক্ত বৃথা যেতে পারেনা’।

রাত পোহাবার আগেই সামরিক সরকারের তল্পিবাহক পুলিশ বাহিনী দেয়ালে সাদা চুন টেনে মুছে ফেলে সেই স্লোগান। কিন্তু তৎকালীন ছাত্র সমাজের হৃদয় থেকে মুছতে পারেনি ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া ছোট্ট শিশু দিপালী সাহার রক্তের দাগ।

যে চেতনার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে এদেশে সংঘটিত হয়েছিল বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, নির্মিত হয়েছিল উনসত্তর-একাত্তরের  সৌধ, সেই চেতনার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে, দিপালী-কাঞ্চনের রক্ত ছুঁয়ে নেয়া শপথ তৎকালীন ছাত্র সমাজ ব্যর্থ হতে দেয়নি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার। যদিও সেই দাবি পূরণ করেনি সরকার।

কিন্তু কি ঘটেছিল সে দিন?
ফাল্গুনের আগুনরাঙা বসন্তে বাসন্তী রঙের সাথে কেন মিশে গেল মানুষের রক্ত? কেন প্রাণ দিতে হল জাফর-জয়নাল-কাঞ্চন কিংবা ছোট্ট শিশু দিপালী সাহাকে?

১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ বৃটিশ-পাকিস্তানীদের প্রেতাত্মা রূপে ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হয় নব্য স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সামরিক শাসন জারির প্রথম দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করে। সেখান থেকেই শুরু দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায় বসেই তাঁর অনুগত শিক্ষা মন্ত্রী মজিদ খানের নেতৃত্বে গঠন করে জাতীয় শিক্ষা প্রণয়ন কমিটি। রচিত হয় শিক্ষা সংকোচন ও বাণিজ্যিকীকরণের নতুন দলিল। বলা হয় উচ্চ শিক্ষার ব্যয়ভার ৫০ ভাগ বহন করতে হবে ছাত্রদেরকে। চাকুরীজীবী, কৃষক-শ্রমিকের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার অপ্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয় এই শিক্ষানীতিতে। ছাত্র সমাজ ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে এই শিক্ষানীতি।

১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর মধুর ক্যান্টিনে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান। ১৯৮৩ সালের ২৭-২৮ জানুয়ারি ২ দিনব্যাপী পালিত হয় সফল ছাত্র ধর্মঘট। ১৪ ফেব্রুয়ারি হাতে নেয়া হয় সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী। ঐ দিনই ঘটে ছাত্রদের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। একাত্তরের পর এতবড় ছাত্র আন্দোলন এর আগে কখনো সংঘটিত হয়নি। সকাল ১১ টায় কলা ভবনের সামনে থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। সচিবালয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত মিছিল হাইকোর্টের গেটের সামনে এসে পুলিশি বাঁধার মুখে পড়ে।

হাইকোর্ট গেট থেকে বাংলা একাডেমি পর্যন্ত লম্বা মিছিল তারকাটা ব্যারিকেডের সামনে সমাবেশ শুরু করে। কিন্তু কোন প্রকার উসকানি ছাড়াই পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। গুলিবিদ্ধ  জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে পুলিশ। ছাত্রদের উপর পুলিশী তাণ্ডবের সময় শিশু একাডেমির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ছোট্ট শিশু দিপালী সাহা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। জাফর-জয়নাল-দিপালী-কাঞ্চন সহ নিহত হয় ১০ জন। পুলিশ সেদিন শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে ক্যাম্পাসে। দুই সহস্রাধিক ছাত্র জনতাকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়।  গ্রেপ্তারকৃত মেয়েদের উপরও চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন। স্বৈরশাসকের গুলির তীব্র ঝাঁজালো বারুদের গন্ধ, লাঠি-বুট-টিয়ারশেল আর জাফর-জয়নাল-দিপালী-কাঞ্চনের রক্তের স্রোতে নির্মিত হলো নতুন আর এক ইতিহাস ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’।

কিন্তু কালের আবর্তনে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’এর চেতনা আজ হারাতে বসেছে। জীবন দিয়ে যারা ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল গণতন্ত্র, শিক্ষার সর্বজনীনতার অধিকার, বিস্মৃত হতে চলেছে তাদের সংগ্রামী চেতনা। মুক্তবাজার অর্থনীতি আর কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রবল জোয়ারে এই ঐতিহাসিক দিনটিও পরিণত হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির দিন হিসাবে।

প্রেম-ভালবাসার মত স্বাভাবিক সম্পর্ককে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে পরিণত করে ‘তুমি আর আমি’র মত চরম স্বার্থপর, সমাজ বিচ্ছিন্ন চেতনা যুব সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে বিস্মৃত করা হচ্ছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের চেতনাকে। এ সবই করা হচ্ছে ক্যাবল আর স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে। সাম্রাজ্যবাদী প্রচার মাধ্যম থেকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস আমাদের কাছে আসেনি। এসেছে অপ-সংস্কৃতি, নোংরামি। একদিকে এদেশীয় শোষকেরা মানুষকে নিঃস্ব করেছে, অন্যদিকে তারা মানুষের বিবেককে বন্দি করতে চাইছে। শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে আর সাংস্কৃতিক ভাবে চূড়ান্ত আক্রমণ নামিয়ে এনেছে।

এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ছাত্র-যুব শক্তিকেইতো এগিয়ে আসতে হবে। ইতিহাস বলে, যখনই একটা সমাজের উপরে, মানবতা, সভ্যতা, মনুষ্যত্বের উপরে আক্রমণ এসেছে যুগে যুগে কালে কালে যৌবনের শক্তি, তারুণ্যের শক্তিই তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের এই ছাত্র-যুব সমাজ কি আজকে সেই ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে?



লিখেছেন- রনেন সরকার রনি, আইনজীবী, সিলেট জজ কোর্ট  (Ronen Sorkar Rony, Advocate, Sylhet Jorge Court) 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...