সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ব্যাকলগে করোনার প্রকৃত চিত্র ওঠে আসছে না

আজ করোনা শনাক্তের সংখ্যা এসেছে ১০৩৪ জন। আগামীকাল যদি এই সংখ্যা হঠাৎ করেই ৫৩৪ জনে নেমে আসে তাহলেও মোটেও আশ্চর্য হবো না। কিংবা আগামী পরশু এই সংখ্যা বেড়ে যদি আবার অকস্মাৎ ১১৩৪ জনে ওঠে তাহলেও আমাদের মতো আমজনতার আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

শনাক্তের সংখ্যার গ্রাফের এই নিয়মিত ও অবধারিত ফ্লাকচুয়েশন পৃথিবীর আর কোন দেশে হয়েছে বা হচ্ছে বলে আমাদের জানা নেই। অন্যান্য দেশগুলোতে আমরা দেখছি গ্রাফ যখন উপরে উঠছে তখন একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপরেই উঠছে তারপর যখন নিচে নামা শুরু হচ্ছে তখন আস্তে আস্তে নিচের দিকেই নামছে।

করোনা ভাইরাসের এখন পর্যন্ত প্রায় তিনশত রকমের স্ট্রেইন আবিস্কৃত হয়েছে, একেক অঞ্চলে একেক স্ট্রেইনের প্রাদুর্ভাব বেশি। একেক দেশে গিয়ে একেকরকম আচরণ করছে করোনা ভাইরাস! তবে আমাদের করোনা রোগী শনাক্তের হারে এই ফ্লাকচুয়েশনের জন্য করোনার এই আচরণ পরিবর্তন দায়ী নয় বরং আমাদের নিজেদের আচরণ পরিবর্তনই এই ফ্লাকচুয়েশনের জন্য দায়ী।

বস্তুত: আমাদের দেশে করোনা যতটা না পরিবর্তিত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি পরিবর্তিত আচরণ করছি আমরা! কখনো খুলছি, কখনো বন্ধ করছি আবার কখনো বন্ধ করছি কখনো খুলছি! আমাদের কাছে জীবনের চেয়ে জীবিকার মূল্যই বেশি! আমাদের এই পরিবর্তিত আচরণে করোনা নিজেও হয়তো হতভম্ব হয়ে আছে।

পৃথিবীর আর আর দেশে 'টেস্ট ফর কন্টাক্ট ট্রেসিং' যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফলো করা হচ্ছে তার কোন বালাই-ই নেই আমাদের দেশে! এখানেও আমরা পরিবর্তিত আচরণ করছি!

ধরুন, আজ যদি ১০ জন রোগী শনাক্ত হয় এবং যদি ধরে নিই এই ১০ জনের প্রতি ১ জন ন্যূনতম ১০ জনের সংস্পর্শে এসেছেন তাহলে আগামীকাল এই ১০ জনের (১০x১০)=১০০ জন কন্টাক্ট পার্সনের মধ্যে কমপক্ষে ১০/১২ জন করোনা পজিটিভ আসার কথা; কারণ আমরা জানি করোনা অতি উচ্চমাত্রার সংক্রামক একটি ভাইরাস। এছাড়া যেহেতু ইতিমধ্যেই কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে গেছে সেহেতু কন্টাক্ট ট্রেসিঙের বাইরেও আরও কিছু নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে আজকের শনাক্ত ১০ জন রোগীর বিপরীতে আগামীকাল আমাদের শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ন্যূনতম ২৫/৩০ জন হওয়ার কথা কিন্তু আমরা আসলে কী দেখছি?

পুরোই মাথা নষ্ট অবস্থা, পুরোই টালমাটাল অবস্থা! দু'দিন বেশি, দু'দিন কম আবার দু'দিন বেশি, দু'দিন কম! পুরোই রেগুলারলি ইররেগুলার অবস্থা! এরকম ইররেগুলারিটির পিছনে আরেকটা কারণ হলো 'ব্যাকলগ'। কোন কোন দিন আমরা দক্ষ জনবলের অভাবে দিনের কাজ দিনে শেষ করতে না পেরে জমা করে রেখে দিচ্ছি, সেটা পরের দিনের শনাক্তের সাথে গিয়ে যোগ হচ্ছে ফলে সেদিন শনাক্তের হার বেশি দেখাচ্ছে। যেদিন 'ব্যাকলগ' যোগ হচ্ছে না সেদিন শনাক্তের হার কম দেখাচ্ছে! আবার সরকারি ছুটির দিনগুলোতে কোথাও কোথাও কোনরকম টেস্টই হচ্ছে না ফলে পরেরদিন শনাক্তের হার কম দেখাচ্ছে!
শনাক্তের হারের ফ্লাকচুয়েশনে এটাও একটা অন্যতম কারণ। আসলে ব্যাপারটাকে আমরা কতোটুকু গুরুত্ব দিয়েছিলাম বা এখনো দিচ্ছি সেটাই একটা বড় প্রশ্ন!
শনাক্তের হারে এরকম ফ্লাকচুয়েশনের আরেকটি কারণ হলো স্যাম্পল কালেকশনে ফাংশনাল এরোর! স্যাম্পল কালেকশনে যেমন সূক্ষ্ম ইন্সট্রুমেন্টাল সাপোর্ট দরকার তেমনি দরকার দক্ষ জনবল। দক্ষ ল্যাব টেকনিশিয়ান। শনিবার খবরে দেখলাম মাত্র ১৮ জন ল্যাব টেকনিশিয়ান দিয়ে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্যাম্পল কালেকশান করা হচ্ছে! কী আশ্চর্য কথা! এই হলো তিনমাস জুড়ে আমাদের প্রস্তুতির গল্প! ল্যাব টেকনিশিয়ান ছাড়া আর যাদেরকে আমরা স্যাম্পল কালেকশন করতে দেখছি তারা ল্যাব টেকনিশিয়ান নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্যাকমো বা এই ধরনের অদক্ষ জনবল দিয়ে স্যাম্পল কালেকশন করানো হচ্ছে। ফলে ফাংশনাল এরোরের সম্ভাবনা অনেকগুণ বেড়ে যাচ্ছে!

যাইহোক, শেষ কথাই আসা যাক। আমরা জানি কন্টাক্ট ট্রেসিং বা স্যাম্পল টেস্টিং কোনটাই করোনার ওষুধ নয়, উপশমও নয়। তারপরও আমরা কেন এই টেস্টিং ও ট্রেসিং নিয়ে এতো চিৎকার চেঁচামেচি করছি? চিৎকার করছি কারণ আমরা যদি প্রপার কন্টাক্ট ট্রেসিং করে তাদেরকে টেস্ট করাতে পারি তাহলে শনাক্তের মোটামুটি একটা রিয়েল পিকচার পাবো। চেঁচামেচি করছি কারণ নতুন যাদের উপসর্গ আসবে আমরা যদি তাদের অধিকাংশেরই টেস্ট করাতে পারি তাহলে শনাক্তের মোটামুটি একটা রিয়েল পিকচার আমরা পাবো। আর শনাক্তের রিয়েল পিকচারটা পেলেই আমরা শনাক্তদেরকে যথাযথ কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করে করোনার বিস্তারটা সামগ্রিক হারে বেঁধে ফেলতে পারবো, আটকাতে পারবো।

এখনো পর্যন্ত যেহেতু করোনার কোন কার্যকারী ওষুধ আবিস্কার হয়নি সেহেতু এটাই করোনার আপাত ওষুধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সারাবিশ্বে। আমরা যদি সেই কাজটুকুও গুরুত্ব দিয়ে করতে না পারি, আমরা যদি প্রপার কন্টাক্ট ট্রেসিং আর টেস্টিঙের মাধ্যমে এখনো করোনা আটকাতে না পারি তাহলে আর এই মিছিমিছি টেস্টিং-টেস্টিং খেলে লাভ কি?

লেখক-
ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ: সহ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাউল সাধক চান মিয়া এবং আমার কিছু উপলব্ধি

"রজনী হইসনা অবসান  আজ নিশিতে আসতে পারেবন্ধু কালাচাঁন।। কত নিশি পোহাইলোমনের আশা মনে রইলো রে কেন বন্ধু আসিলোনা জুড়ায়না পরান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। বাসর সাজাই আসার আশেআসবে বন্ধু নিশি শেষে দারূন পিরিতের বিষে ধরিল উজান। আজ নিশিতে আসতে পারে বন্ধু কালাচাঁন।। মেঘে ঢাকা আঁধার রাতে কেমনে থাকি একা ঘরে সাধক চাঁনমিয়া কয় কানতে কানতে হইলাম পেরেশান আজ নিশিতে আসতে বন্দু কালাচাঁন।"    গভীর নিশিতে ধ্যান মগ্ন হয়ে কালাচাঁনের অপেক্ষা করছেন সাধক।  সাধক চান মিয়ার শিষ্য বাউল সিরাজউদ্দিনের মতে এটি একটি রাই বিচ্ছেদ। কৃষ্ণের অপেক্ষায় রাধা নিশি বা রাতকে অনুরোধ করছেন 'রাত' যেন না পোহায়  কারণ তার কালা চান যে কোন সময় আসতে পারে। শব্দগুচ্ছ গুলো থেকে সহজেই উপলব্ধি হয় সাধক নিজ দেহকে রাধা আর আত্মাকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেছেন। দেহ আত্মার মিলন ঘটানোই ছিল সাধকের সাধনা।        বাউল সাধক চান মিয়া উপরোক্ত গানটি রচনা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার খাটপুরা গ্রামে ১৩২৫ বঙ্গাব্দে সাধক চান মিয়ার জন্ম। পুরো নাম চান্দেজ্জামান আকন্দ হলেও বা...

বাউল, বাউলতত্ব এবং কিছু কথা

একজন ভদ্র বন্ধু বরের সাথে বাউল সম্প্রদায় নিয়ে বেশ তর্ক হলো রাতে। তর্কের সূত্রপাত ছিল বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী। ভাবলাম "বাউলতত্ত্ব"র আলোকে বাউলরা ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী তা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা আবশ্যম্ভাবী। কয়েকটি ধারাবাহিক পর্ব লিখে নিজের মনোভাব বোঝানোর চেষ্টা করব।  শুরুতেই শক্তিনাথ ঝাঁ এর বস্তুবাদী বাউল বই থেকে কিছু কথা লিখতে চাই; বাস্তব জগত ও জীবনকে এরা কোন আনুমানিক যুক্তি বা আলৌকিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে নারাজ। জৈব রাসায়নিক ব্যাখায় এরা নারীর রজঃ এবং পুরুষের বিজে জীবন ও জগত সৃষ্টিকে ব্যাখা করে এবং চার ভূতকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি মনে করে। এভাবে মানুষে, প্রকৃতিতে তৈরি করে প্রাণ, প্রাণী। অনুমান ভিত্তিক স্বর্গ, নরক, পরলোক, পুনর্জন্মাদি প্রত্যক্ষ প্রমাণাভাবে বাউল আগ্রাহ্য করে। মানুষ ব্যাতিরিক্ত ঈশ্বরও এরা মানে না। সৃষ্টির নিয়মকে জেনে যিনি নিজেকে পরিচালনা করতে শিখেছেন- তিনিই সাঁই। সুস্থ নিরোগ দীর্ঘজীবন এবং আনন্দকে অনুভব করার বাউল সাধনা এক আনন্দমার্গ।।  বাউলরা ভাববাদী না বস্তুবাদী এর অনেক সূক্ষ বিশ্লেষণ শক্তিনাথের বস্তুবাদী বাউল বইটির মধ্যে আলকপাত করা হয়েছে। সাধারণ সমাজে এ ধা...

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী

হাওরের বুক বেয়ে চলছে একটি নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কথা বলছি। ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '। শাহ আব্দুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা ' আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই।  বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আব্দুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাকে এক ঘরে করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আব্দুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।  আমি কুল হারা কলঙ্কিনী...